দেশে সামগ্রিক রাজনৈতিক হালচাল অধিকাংশ সময়েই বেশ অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতায় ঘেরা থাকে। ফলে বিদ্যমান সংকট কাটিবার লক্ষণ বিষয়ে জনমনে একরাশ হতাশাই পরিদৃষ্ট হয় কেবল। সকলেই চাহেন গণতান্ত্রিক সুস্থ ধারায় দেশ পরিচালিত হউক এবং জনগণই যে সকল ক্ষমতার উত্স উহা আমাদের শাসকদের কার্যধারায়ও প্রোথিত হউক। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই দেশে বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরিয়া বহু প্রাণ অকালে ঝরিয়া গিয়াছে। কিন্তু গণতন্ত্রকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করাইবার ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে নানাবিধ দুর্বলতা ও গড়িমসি এবং আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হইয়াছে উহা দুর্ভাগ্যজনক। নানান প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করিয়া অকুতোভয়ে সম্মুখপানে আগাইয়া যাওয়া তথা গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে প্রয়োজনীয় যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেখানে সর্বাপেক্ষা জরুরি সেখানে বিভেদ, মতভেদ ইত্যাদির কারণে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ধরনের ব্যবধান রচিত হয় উহা কোনক্রমেই দেশের জন্য মঙ্গল বহিয়া আনিতে পারে না। কিন্তু সত্য এই যে, এই পরিস্থিতিই আমাদের দেশে ঘোরতর সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী। রাজনৈতিক সংকট কাটাইয়া উঠিয়া একটি সুস্থ ধারায় শাসন ব্যবস্থা কার্যকর করিতে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব রহিয়াছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলিয়া কাহারোই এই দায়িত্ব এড়াইয়া যাইবার সুযোগ নাই। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া উভয়পক্ষে যে ধরনের দ্বন্দ্ব, জেদ, রেষারেষি বা কোন্দল চলিতেছে সকলেই উহার অবসান চাহেন। উভয়পক্ষেই তাই শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া একান্তই আবশ্যক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃ প্রবর্তন বিএনপির প্রধানতম দাবি। এই ব্যবস্থার পুনঃ প্রবর্তন ব্যতিরেকে তাহারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবে না এমন কথা বারবার উচ্চারণ করিয়াছে। অন্যদিকে আবার সরকার ইতোমধ্যে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাকে রদ করিয়াছে। ফলে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে নানাবিধ সন্দেহ-শংকা-আশংকা দেখা দিয়াছে বৈ কি! গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখিতে নির্বাচন অপরিহার্য। অবাধ-নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন সকলেই চাহেন। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক গতিধারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নমুখী রূপ পরিগ্রহ করায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বা গ্রহণযোগ্যতা লইয়া বারংবার প্রশ্ন তোলা হইয়াছে। সরকার নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানপূর্বক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে আয়োজন করিতে চাহে উহার উপর বিরোধী দলের আস্থা নাই বিধায় তাহারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটিকেই তাহাদের মুখ্য ইস্যুতে পরিণত করিয়া আন্দোলন-সংগ্রাম চালাইয়া যাইতেছে। এমতাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই সকল পক্ষের নিকট একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়টি হালে পানি পাইতেছে। কিভাবে সেইরূপ একটি পরিবেশ ও ব্যবস্থা কায়েম করা যায় তাহা লইয়া সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মধ্যে আলাপ-আলোচনার বিকল্প নাই ইহাই সকলে মনে করেন। ইতোমধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সরকার পতন আন্দোলনের ডাক দেয়। তবে গত বুধবার বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে যে চিঠি দিয়াছে উহার মধ্যে কতগুলি বিষয় অনুসন্ধানী পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় নাই নিশ্চয়ই! ঐ পত্রে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত-সামর্থ্যবান হইয়া কাজ করিবার আহ্বান, নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী নিয়োগ এবং অন্য যেসব প্রস্তাবনা করা হইয়াছে উহাতে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহই প্রকারান্তরে ব্যক্ত হইয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। এই অনুমান সত্য হইলে উহা অবশ্যই সকলের জন্য শুভ সংকেত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনকে একদফা দাবি হিসাবে উপস্থাপনপূর্বক বিএনপি যে আন্দোলন করিয়া যাইতেছে উহার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে প্রদত্ত পত্র তাহাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে আগ্রহকেই তুলিয়া ধরিতেছে বৈকি। বিএনপির এই পত্র বা নির্বাচন কমিশনের সহিত কথোপকথন সে কারণে খানিক স্বস্তিকর বলিয়া বিবেচিত হইবার দাবি রাখে। সকলেই আসলে রাজনৈতিক অচলাবস্থার বা অনিশ্চয়তার অবসান চাহেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ক একদফা দাবির ব্যাপারে অনড় অবস্থানের পরিবর্তে খানিক ছাড় প্রদানপূর্বক নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোন প্রকার আগ্রহ অবশ্যই জনমনে স্বস্তি ফিরাইয়া আনিতে পারে। আর সত্য সত্যই যদি বিএনপি এমন অবস্থান গ্রহণ করিয়া থাকে তবে এক কথায় উহা সকলের জন্যই স্বস্তিকর।
