ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারখানা

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৩, ২১:২৭
গার্মেন্টস কারখানাগুলিতে বিপুল প্রাণহানি এবং অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধ্বংসযজ্ঞের পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি লইয়া সম্প্রতি গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি রাজধানীতে ৩৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারখানা চিহ্নিত করিয়া প্রতিবেদন দাখিল করিয়াছে। ইহাদের অধিকাংশই অবস্থিত পুরাতন ঢাকায়। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলির বেশিরভাগই পুরাতন জরাজীর্ণ ভবনে স্থাপন করা হইয়াছে, সিঁড়িগুলি সরু এবং বেশ কয়েকটির কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নাই। কারখানাগুলি তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ কিংবা বিকেএমইএ’র সদস্য নয়। এগুলির অধিকাংশেরই শ্রমিক সংখ্যা ৫০ জনের নীচে এবং তাহারা বড় বড় গার্মেন্টস কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ করে। এগুলি যেকোনো সময় বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি করিতে পারে বলিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করিয়া উক্ত কমিটি কারখানাগুলি দ্রুত রাজধানী হইতে সরাইয়া লইবার পরামর্শ দিয়াছে। বস্তুত, রাজধানীর শিল্প এলাকা ছাড়াও যেখানে-সেখানে অপরিকল্পিতভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে গার্মেন্টস কারখানা। এইসব কারখানায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নাই, নাই বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা, শ্রমিকদের জন্য নাই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। সামান্য বেতন, মাত্রাতিরিক্ত শ্রম শোষণ এবং বাধ্যতামূলক ওভারটাইমসহ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশের কারণে শ্রমিকদের কাজের মানও খারাপ হইতেছে। ১৯৭৮ সালে ২টি গার্মেন্টস কারখানা দিয়া যে শিল্পের যাত্রা শুরু সেখানে আজ প্রায় ৪৫০০টি কারখানা স্থাপিত হইয়াছে। ৩০ লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের সবচাইতে সস্তা শ্রমিক পাওয়ার কারণে বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম (চীন ও তুরস্কের পর) গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হইয়াছে। মূলত, দেশের রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগই এখন আসিতেছে গার্মেন্টস খাত হইতে। ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১৫০ কোটি ডলার। দুই দশক পর এখন তা বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু, এই সময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিধি বাড়িলেও বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তার পরিধি। ১৯৯০ সাল হইতে এ পর্যন্ত তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাগুলিতে ছোট বড় ৩০টি দুর্ঘটনায় ৪০০ শ্রমিক মারা গিয়াছেন। আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়া দেশ ও বিদেশে ফের আলোচনায় আসিয়াছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। পাশাপাশি উঠিয়া আসিয়াছে ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারাখানার বিষয়টিও। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলিতেছে, শতভাগ কমপ্লায়ান্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রহিয়াছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যাহারা কাজ করেন তাহাদের সংগঠনগুলি বলিতেছে, সাড়ে পাঁচ হাজার গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কারখানাতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাই। বাংলাদেশ সোস্যাল কমপ্লায়ান্স ইনিশিয়েটিভের (বিএসসিআই) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাত্র ৩০০-৫০০ কারখানা কমপ্লায়ান্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন। আর, অধিকাংশ কারখানাই অদক্ষ শ্রমিকসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। সবচাইতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হইল সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলি। এই কারখানাগুলির সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এইসব কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা একেবারেই নাই। শ্রম আইন বিষয়ে এইসব কারখানার কর্তৃপক্ষের নেই কোনো জানাশোনা, মালিক ও শ্রমিক সম্পর্কও খুব একটা ভাল নয়। সুতরাং, আমরা বলিব, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিজিএমইএ কিংবা বিকেএমইএ বহির্ভূত প্রবল ঝুঁকিবহুল সাব-কনট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলি শনাক্ত করিয়া যথার্থ পরামর্শ দিয়াছে বটে। কিন্তু, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সদস্যতালিকাভুক্ত অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানাতেও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিয়মিত বেতন এবং সর্বোপরি জীবনের নিরাপত্তা নিয়া প্রশ্ন আছে। তাজরীন এবং আরও কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড, মৃত্যু, শ্রমিক অসন্তোষ ও হয়রানি এবং বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের ঘটনা নজির হিসাবে আমাদের সামনে রহিয়াছে। আমরা মনে করি, শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করিতে এবং সর্বোপরি, শ্রমশোষণ ও অপচয় থামাইয়া গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন সাধনে সরকার আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ লইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন