আবারও সেই একই দৃশ্য। হরতালের নামে গাড়ি পোড়ানো, মানুষ পোড়ানো, দোকানপাট, অফিস-আদালত, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ। একদল লোক পেট্রোল হাতে, বোমা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়ি পোড়াতে, মানুষ পোড়াতে। লেখাটি লিখতে বসার আগেই তিনজন ডাক্তারের গাড়িতে পেট্রোল বোমা মারার সংবাদ পেলাম। ঘটনার নির্মম শিকার কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের একজন শিক্ষক ডাক্তারের অবস্থা আশংকাজনক। এবারে হরতালের দিন নয়, তার আগের দিনের সকাল হতেই জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়েছে, আর সেই ঘটনারই সন্ধ্যারাতের তাণ্ডবের শিকার হলেন তিনজন ডাক্তার। তাদের কেউ আমার সন্তানও হতে পারতো। এসব ঘটনায় আমার ভাবতে লজ্জা করে দেশটা স্বাধীন করেছি। হ্যাঁ, স্বাধীনতার এতোদিন পরও রাজনীতিবিদদের বোধোদয় না হওয়ায় এ স্বাধীনতাকে নিয়ে আর গর্ব করতে ইচ্ছা করে না। যে স্বাধীনতায় গর্ভবতী মায়ের প্রসব বেদনা ঠেলে হাসপাতালে যাওয়ার সময় বোমা মেরে গাড়ি উড়িয়ে দেয়া হয়, ক্ষুধার্ত শিশুর অন্ন যোগাতে রাস্তায় বের হওয়া রিকশাচালক, ভ্যানচালক, সিএনজি চালক, বাস চালকের উপার্জনের অবলম্বন পুড়িয়ে উল্লাস প্রকাশ করে বলা হয় হরতাল সফল হয়েছে সে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা থাকে না। যে স্বাধীনতায় গ্রামগঞ্জ, মঙ্গাপীড়িত এলাকা হতে আসা গার্মেন্টস কর্মীরা পেটের ভাত উপার্জনের জন্য শ্রম দিতে গার্মেন্টসে যেতে পারেন না, দেশের শিল্পোদ্যোক্তরা শিল্প- কারখানা চালু করতে পারেন না, উত্পাদিত পণ্য রাস্তায় বের করতে পারেন না, দোকানি দোকান খুলতে পারেন না, রাস্তার ভিক্ষুকের ভিক্ষা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়, সে স্বাধীনতা অর্থহীন। আমি রাজনীতিবিদ এবং তাদের হাইকমান্ডের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, আর কত বছর আপনারা দেশ ও জাতিকে জ্বালাবেন, পোড়াবেন? দেশের কলকারখানা, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত আর কতকাল কতযুগ আপনাদের হাতে জিম্মি থাকবে সে কথাও আপনারা জানিয়ে দিন। এই যে দেশের অসহায় নিরীহ সাধারণ মানুষ আপনাদের দেখে অসম্মানের দৃষ্টিতে তাকায় তাকি আপনারা দেখতে বা বুঝতে পারেন? আর কতদিন আপনারা এভাবে চলবেন? রাজনীতির নামে আর কত মায়ের কোল খালি করবেন, কত বোনের আহাজারিতে দেশের আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলবেন? সবাই মিলে দিনরাত কূটবুদ্ধি কূটচাল দিয়ে ঘোট পাকিয়ে দেশটাকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে কার কতটুকু লাভ হবে সে কথা কি কেউ ভেবে দেখেছেন? আপনাদের কার্যকলাপ দেখলে সুলতান মাহমুদের ১৭ বার ভারত আক্রমণের কথা মনে পড়ে যায়। সুলতান মাহমুদ যেমন সোমনাথ মন্দিরের ধনরত্ন লুণ্ঠনের জন্য ১৭ বার সোমনাথ মন্দিরে হানা দিয়েছিলেন, তেমনি আপনারাও কি দেশটাকে সোমনাথ মন্দির মনে করছেন? আপনাদের ভাবসাব দেখে তো তাই মনে হয়। আপনাদের রাজনৈতিক দলসমূহকে তো এখন আর রাজনৈতিক দল মনে হয় না। রাজনীতিতে জনসেবা বলতে যা বোঝায় তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কেন? আপনাদের নির্মমতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা আপনারা জানেন না!
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট
