রা জ নী তি

গণতন্ত্রের অনিশ্চিত গন্তব্য

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২১:০২
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন ও তা অব্যাহত রাখার জন্য একাধিক রাজনৈতিক দল থাকা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সমমনা নাগরিকগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন, একটি স্বতন্ত্র মঞ্চে সমবেত হতে পারেন। কোন একটি মতাদর্শ বা মূলনীতিকে পুরোভাগে আনা, রাষ্ট্র/সরকার পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা ও ভবিষ্যতের সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দল থাকা জরুরি। দল না থাকলে গণতন্ত্রের সূচনা কিংবা বিকাশ কোনটাই হয় না, বরং স্বৈরতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। বলা যায়, দলব্যবস্থা ও গণতন্ত্র পরস্পরের সহগামী। বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে গণতন্ত্র চর্চার চেষ্টা চলছে। বিশ শতকের প্রথম ভাগের দিকে এ অঞ্চলে দলব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। এ থেকে বোঝা যায় যে, জনগণের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আগ্রহ ও ব্যাকুলতা রয়েছে। সেই মোতাবেক একটি বহুমাত্রিক সমাজমানস ইতোমধ্যে গড়ে উঠলেও প্রায়শই জাতীয় নেতৃত্বে তার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় না। সেজন্যই গণতন্ত্র মসৃণ পথ ধরে অগ্রসর হতে পারে নাই, হোঁচট খেয়েছে বারবার। এর নিকৃষ্টতম উদাহরণ হচ্ছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তীকালে বাকশাল গঠন ও বহুদলীয় ব্যবস্থার উচ্ছেদ। এর পরে পদ্মা মেঘনা গোমতি দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। বাকশালের ধ্বংসস্তূপের উপর জাতি নবউদ্যমে গণতন্ত্র চর্চার পক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর বহুদলীয় ব্যবস্থার বিকাশ হলেও কার্যত দেশে দ্বিদলীয় ব্যবস্থাই অলক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিগত দুই দশকে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘুরে-ফিরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা হিসেবে দাবি করে । এদিকে বিএনপি নিজেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। জনগণের দৃষ্টিতে লীগ ভারতমুখী তথা হিন্দুবান্ধব একটি দল। অন্যদিকে বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধের অনুকূল ও ভারতবিমুখ দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই দল দু’টিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে জাতি দু’টি আলাদা শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিগত সিকি শতাব্দীকালে জাতি লক্ষ্য করেছে এ দু’টি দল একদিকে দেশের দু’টি প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। সেইসাথে এদের দু’য়ের মধ্যে দূরত্বও ক্রমবর্ধমান। দল দু’টির নেতৃবৃন্দ তথা দুই শীর্ষনেত্রী যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, রাজনৈতিক শত্রুর অবস্থানে পৌঁছে গেছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগযোগ প্রায় ট্যাবু হয়ে উঠেছে, পরস্পরের মুখ দেখতে পর্যন্ত নাস্তি। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এহেন মনোভঙ্গি গণতান্ত্র্ত্রিক রাজনৈতিক ধারণার পরিপন্থি, জাতির জন্য অনিষ্টকর। এর নানা নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে প্রতিনিয়ত। দ্বিদলীয় ব্যবস্থা অন্য অনেক দেশেই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ঐ দেশের উভয় দলের নেতাদের মধ্যে এমন রেষারেষি বা পরস্পরকে দুশমন জ্ঞান করার কোন লক্ষণ দেখা যায় না। সম্প্রতি বিএনপি তার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ কর্মীসমাবেশ আয়োজন করে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ নানাস্তরের নেতাকর্মী সমর্থক বহু নারী-পুরুষ সেখানে সমবেত হয়। দেখা গেল সভাটি যখন শেষ পর্যায়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সমাপনী ভাষণদান করছেন তখন সভাস্থলের বিপরীত দিক থেকে নিক্ষিপ্ত কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি, ছুটোছুটি। সভাটি পণ্ড হয়ে যায়। এর পরের ঘটনাবলী প্রায় সকলেরই জানা। অনতিদূরে অবস্থানরত পুলিশ বাহিনী পলায়নপর লোকদের উপর হামলে পড়ে, আবার জলকামান দিয়েও চালানো হয় আক্রমণ। সেইসাথে চলে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। তাতে আহত হন কয়েকজন সামনের সারির নেতা। সন্ত্রস্ত নেতৃবৃন্দ সভামঞ্চ ত্যাগ করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এখানেই পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি। অবিলম্বে পুলিশ সদর্পে প্রবেশ করে বিএনপি কার্যালয়ের অভ্যন্তরে। তল্লাশির নামে অফিসে ব্যাপক ভাংচুর করে, তছনছ করে অফিসের নানা জিনিসপত্র। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রবল আক্রোশে মহাসচিবের কক্ষের দরজা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। দলীয় চেয়ারপার্সনের কক্ষটিও ভাঙ্গা হয়, যদিও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এসব কক্ষে অবস্থানকারী বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে পুলিশ বচসায় লিপ্ত হয় এবং অশোভন আচরণ করে। তাদের জোরপূর্বক অফিসের বাইরে বের করে আনা হয়। অতঃপর দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে ঠেলাধাক্কা দিয়ে পূর্বাহ্নেই হাজিরকৃত গণ্ডাখানেক প্রিজনভ্যানে তুলে নেয়া হয়। কোন প্রতিবাদ, আপত্তি কিংবা কোন প্রশ্নের উত্তর উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা না দিয়ে কিংবা কোন গ্রেফতারি পরওয়ানা না দেখিয়েই সবাইকে আটক করে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে। বিএনপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পুলিশ শুধু অফিসটি লণ্ডভণ্ডই করেনি, মূল্যবান কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সুটকেসভর্তি লক্ষ লক্ষ চাঁদার টাকা, বছরের পর বছর ধরে রক্ষিত পার্টির নানান রেকর্ডপত্র, অন্যান্য দরকারি কাগজপত্রও নিয়ে যায়। এক কথায় অফিসটিতে লংকাকাণ্ড করে বসে পুলিশ। পুলিশের এহেন ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড—লুটপাট, ভাংচুর এবং নেতাদের গণগ্রেফতার অসম্মান, অপমানজনক আচরণ কোন সভ্যসমাজে কল্পনা করা যায় না। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটা অবিশ্বাস্য। কেবল দুর্দান্ত স্বৈরতান্ত্রিক বা ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট শাসনেই এমনটা সম্ভব হতে পারে। গণতন্ত্রের প্রতি তিলার্ধ পরিমাণ অনুরাগ থাকলে হেন আচরণ করা যায় না। অথচ সরকার পুলিশের এই তাণ্ডবকে প্রকাশ্যে অনুমোদন করছে। ক্ষমতার শেষলগ্নে এসে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নগ্ন হামলা চালিয়ে সরকার একদিকে তার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে প্রকটিত করেছে, অন্যদিকে তার অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী চরিত্রের উত্কট প্রকাশ ঘটিয়েছে। নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার উদগ্র বাসনার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এই পুলিশি এ্যাকশন। এই ঘটনায় দেশের জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। পূর্ববর্তী সপ্তাহের গণহত্যার বিলাপ ও রক্তের দাগ মিলিয়ে যাবার আগেই এহেন জঘন্য হামলা সমগ্র জাতিকে আরেকবার ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব করেছে। জনগণের বুঝতে বাকি নেই যে, আওয়ামী জোট সরকার দলীয় ক্যাডারদের চাপাতি ও দলবাজ পুলিশ বাহিনীর বুটের নিচে ঠেলে দিয়েছে গণতন্ত্রকে। এই সরকারের গণতন্ত্রের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই, নেই বিরোধী দলের প্রতি সমীহবোধ, আর মানবাধিকারের প্রতি নিদারুণ উদাসীন। ক্ষমতাসীনদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা শুধু বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্নই করতে চায় না, পরন্তু দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য, হানাহানি সৃষ্টি হোক, সমাজের সকল স্তরে একটা রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ুক তাও চায়। আর এর মধ্য দিয়ে দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তারই ফাটল দিয়ে বেয়ে দেশে কোন তৃতীয় শক্তির উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই ফাঁকে কুশাসনের বোঝা ফেলে দিয়ে লীগাররা ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে সটকে পড়বে। এতে তাদের সমস্ত অপকর্ম আড়াল হয়ে যাবে, জবাবদিহিতার কোন অবকাশ থাকবে না। কৌশলে গা বাঁচিয়ে নিজেরা পার পেয়ে যাবে, বিরোধী দলও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। গত চার বছরে মহাজোট সরকার লুটপাট, দখলদারি চালিয়েছে, অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, মিডিয়ার উপর দলন-পীড়ন চালিয়েছে, দেশজুড়ে ত্রাস খুন গুমের রাজত্ব কায়েম করেছে, জাতিকে বিশ্বসমপ্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বিশেষ দেশ/সম্প্রদায়ের পদতলে নৈবদ্য দিয়েছে। সর্বোপরি অন্তহীন দুর্নীতির নয়া মহাভারত রচনা করেছে। তাতে তারা বুঝে গেছে যে, তাদের জন্য ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করা অসম্ভব, জনপ্রিয়তার পারদ নেমে এসেছে একদম তলায়। এই পরিস্থিতিতে তারা দু’টি পথ বেছে নিয়েছে। প্রথমত জেল-জুলুম, হত্যা, গুম, গ্রেফতার প্রভৃতি দ্বারা রাজনীতির ময়দান শূন্য করে, বিরোধী দলহীন ফাঁকা মাঠে একটি সাজানো নির্বাচন করে ক্ষমতা পুনর্দখল করা। দ্বিতীয়ত পুলিশ, র্যাব, দলীয় কর্মী-ক্যাডার দিয়ে দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে কোন একটি তৃতীয় পক্ষের উত্থান ও আগমনের পথ খুলে দিয়ে নিজেরা অলক্ষ্যে সরে পড়া। প্রতীয়মান হয় যে, এধরনের ষড়যন্ত্রের পথ ধরে অগ্রসর হতেই বিএনপির কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। ঘটানো হয় তছনছ, লণ্ডভণ্ড কাণ্ড। শীর্ষস্থানীয় সকল নেতাকে করা হয়েছে কারাবন্দী। এই নজিরবিহীন কাণ্ড কেবল গণতন্ত্র্ত্র হন্তাকররাই করতে পারে। যারা ফ্যাসিবাদী, স্বৈরশাসন কায়েম করতে চায় তাদের দ্বারাই সম্ভব। বস্তুত গণতন্ত্র চর্চা নয়, রাষ্ট্র/রাজনীতি থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেয়ার চক্রান্তই এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পরস্ফুিট হয়েছে। গণতন্ত্র সমঝোতা, সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। সংঘাত, প্রতিহিংসা কিংবা উত্খাতের হুংকার গণতান্ত্রিক ধারণার বিপরীত। ক্ষমতাসীন দল সচেতনভাবেই সংঘাতের পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হচ্ছে প্রতিপক্ষকে বরদাশত করা, তাদের কথা শোনা, তাদের বিরোধিতা করার সুযোগ দেয়া, প্রতিহত করা নয়। কিন্তু বিগত চার বছরে বিরোধী দলকে ঠেকানো, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার সমস্ত কৌশল চর্চা করা হয়েছে। সেই অপচেষ্টা এখন রক্তাক্ত রূপধারণ করেছে। জাতিকে গণতন্ত্রের উন্মুক্ত ময়দান থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সমাজে ক্রমশ আতঙ্ক-উত্কণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে, জাতি হয়ে পড়ছে বিভাজিত। সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত চেতনা প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করার প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে শাসকমহল, রোজ ঘটছে রাজনৈতিক প্রাণহানির ঘটনা। গণতন্ত্রে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, শত্রুতা নয়। কিন্তু বর্তমান সরকার সমাজের নানান মহল/ গোষ্ঠী—আলেম-উলেমা, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী প্রভৃতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে, সংঘাত-শত্রুতা উসকে দিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরিতে আনুকূল্য প্রদর্শন করছে। এতে গণতন্ত্র এগুবে না, তার অপমৃত্যু ঘটবে। বস্তুত এই সরকার হামলা, মামলা ও পুলিশনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ কোন গণতান্ত্রিক সরকার/ শাসনের বৈশিষ্ট্য নয়। বিএনপি অফিসে পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে সরকার যে বীভত্স কাণ্ড ঘটিয়েছে তাতে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এরা গণতন্ত্রকে নির্বাসন দিয়ে দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বিএনপি কার্যালয়ে পুলিশের বেপরোয়া হামলা, হাঙ্গামা, ভাংচুর ও শীর্ষনেতৃবৃন্দের গণগ্রেফতারের ঘটনা দেখে দেশবাসীর এই প্রতীতি জন্মেছে যে, এই সরকার গণতন্ত্র চায় না, এরা একদলীয় শাসন কায়েম করতে চায়। তাই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা সমগ্র জাতিকে যুগপত্ স্তম্ভিত ও হতাশ করেছে। বিরোধী দলকে অস্বীকার ও উত্খাত করার ধারণাকেও গভীরতর করেছে। গণতন্ত্র যে সহিষ্ণুতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার ধারণাকে সমুন্নত রাখে তাকে নস্যাত্ করা হয়েছে। তার ওপর প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার গ্রাম পাড়া মহল্লায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়ে জাতিকে চূড়ান্তভাবে বিভাজিত করে ফেলেছেন। প্রতিপক্ষের নামের তালিকা তৈরি করতে বলে তিনি জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। পরোক্ষভাবে গৃহযুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন বৈকি। তার এই ঘোষণা অবশ্যম্ভাবীরূপে রাষ্ট্রবিনাশী। অখণ্ড জাতি গঠনের মূল দর্শনের বিপরীত। তার সমাজ বিভাজনের এজেন্ডার মধ্য দিয়ে একটি মনোলিথিক রাজনীতিকে সামনে আনার চেষ্টা হচ্ছে। গণতন্ত্রের বিপক্ষে একশ্রেণির লোককে এভাবে ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোকে ধ্বংস বা নির্মূল করার মতো দুর্মর দঙ্গল (হামলাবাজ) তৈরির প্রয়াস এইসব মঞ্চ। মুসোলিনী যেমন একচ্ছত্র নেতৃত্বের অভিলাষে ভ্রান্ত আবেগ উসেক দিয়ে তার পুরো জতিকে/দলকে সহিংস ও ভয়ানক উগ্রবাদী করে তুলেছিলেন, হিটলার যেমন সেমেটিক জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে হত্যা করার উন্মাদনায় জাতিকে উন্মত্ত করে তুলে বিশ্ব জয় করতে চেয়েছিলেন, তেমনি করে আজকে তারুণ্যের নামে জাগরণ মঞ্চ সাজিয়ে ‘ফাঁসি চাই’ ‘জবাই কর’ ইত্যাদি ভয়ংকর শ্লোগান তুলে জাতিকেই বিশেষভাবে নবনবীন প্রজন্মকে অসংযত আবেগে উদ্বেলিত করে তোলা হচ্ছে। দুঃজনকভাবে কোমলমতি স্কুলের বাচ্চাদের টেনে আনা হচ্ছে বড়দের সহিংস তামাশায়। কচি-কাঁচাদের মনকে জিঘাংসা রোষে উত্তপ্ত করে তোলা হচ্ছে। এরা অসুস্থ ও মনোবিকারগ্রস্ত একটি প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠবে, যার পরিণাম হবে ভয়ংকর। এইসব তরুণ নতুন প্রজন্মকে ব্যবহার করে লীগ ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখার বিশ্রী খেলায় মেতে উঠেছে। এদের সাথে নিয়ে হিংস্র প্রপাগান্ডার শাবল দিয়ে গণতন্ত্রকে শিকড় অবধি উপড়ে ফেলতে চাইছে মহাজোট। দেশের জনগণ বিদ্যমান উত্কণ্ঠা, উন্মাদনা আর হিংস্রতার ত্বরিত অবসান চায়। আশঙ্কা-অস্থিরতা থেকে মুক্তি চায়। সংঘাত নয়, সংলাপ আশা করে। আজকে দেশের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষ তাই প্রধান দুই দলের মধ্যে কার্যকর ডায়ালগ দেখতে চায়। বিশ্বের নানা দায়িত্বশীল মহলও সেরকমই দাবি জানাচ্ছেন। গণতন্ত্রের স্বার্থে সংলাপ জরুরি। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাভিমানী সরকার- প্রধানমন্ত্রী ও তার কতিপয় মন্ত্রী-উপদেষ্টা। তারা নানা পূর্বশর্ত জুড়ে দিয়ে সংলাপের পথকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে। অথচ কাঙ্ক্ষিত ডায়ালগ না হলে দেশে হানাহানি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন রসাতলে যাবে গণতন্ত্র, রক্তে ভাসবে দেশ। এমনটা জনসাধারণ চায় না, এমনকি বিদেশি মিত্ররাও নয়। কাজে সরকারি মহলেরই বেশি দায় একটি অর্থবহ সংলাপের দ্বার খুলে দেয়ার । সমাজে শান্ত্তি ও স্থিতিশীলতা অব্যাহত রাখা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করার দায়িত্ব তাদেরই । নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার গঠনের রাস্তা ক্ষমতাসীনদের তৈরি করে দিতে হবে। তাই সংলাপের প্রস্তাব নিয়ে সরকারি মহলকে আগ বাড়িয়ে আসতে হবে। কোন বাধা থাকলে তা তাদেরই দূরীভূত করতে হবে। কোন অন্ধ ইগোর বশবর্তী হওয়ার অবকাশ তাদের নাই। কোনরূপ হার-জিতের সেন্টিমেন্টতাড়িত হওয়াও এক্ষেত্রে অর্থহীন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিনিময় বা যোগাযোগ রাখা জরুরি। অথচ জাতীয় বড় কোন ইস্যুতেও এ দুই দলকে ঐকমত্য পোষণ করতে দেখা যায় নাই। এমনকি শীর্ষনেত্রীদ্বয়ের মধ্যে মতবিনিময় তো দূরের কথা, কালেভদ্রে মুখ দেখাদেখিও হয় না। এহেন আচরণ অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত। জাতির এ ক্রান্তিকালে পরস্পরের সাথে তারা এবার কথা বলবেন এটাই জনগণের চাওয়া। হিংস্রতা, রক্তপাত ও প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধের একটা চমত্কার সুযোগ এসেছে। এই উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে। অন্যথায় সমাজের তৃণমূল স্তরে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও প্রতিহিংসার সূত্রপাত হতে পারে। আখেরে অনেক মূল্য দিতে হতে পারে। বিপন্ন হতে পারে সার্বভৌমত্ব। তাই সরকারি মহল যতদ্রুত বিরোধী পক্ষের প্রতি সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, সংঘাতের পথ ছেড়ে সংলাপের দিকে এগিয়ে আসবে, জাতি ততশীঘ্র শান্তি ও গণতন্ত্রের মহাসড়ক ধরে সমুখে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ লাভ করবে। লেখক :প্রফেসর, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন