গত শুক্রবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ভয়াবহ টর্নেডো আঘাত হানে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা যায়, ইহাতে ২৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে। গুরুতরভাবে আহত হইয়াছেন দেড় শতাধিক মানুষ। তাহারা বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিত্সা গ্রহণ করিতেছেন। টর্নেডোর আঘাতে বিভিন্ন গ্রামের পাঁচ শতাধিক কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হইয়াছে। ইহাছাড়া বোরো ধান নষ্টসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে। যদিও ক্ষতির সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায় নাই।
ঘটনার পর গ্রামবাসী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে হতাহতদের উদ্ধার করিয়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লইয়া যান। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া জানা যায়। সেই মোতাবেক ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, আহতদের চিকিত্সা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিকে খাদ্য ও পোশাকসহ যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হইতেছে। সরকারের তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়া আমাদের এখনই অসন্তোষ প্রকাশের কিছু নাই। সাধারণত টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড়ে কাঁচা বাড়িঘর ও সেইসব ঘরের বাসিন্দারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া থাকে। কেহ কেহ দেয়াল ধস বা পড়িয়া যাওয়া গাছপালার আঘাতে হতাহত হইয়া থাকেন। শুক্রবারের টর্নেডোর বেলায়ও ইহার ব্যতিক্রম হয় নাই। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পার্শ্বে যানবাহনের ওপর গাছ ভাঙিয়া পড়িলে অকস্মাত্ একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া খাদে পড়িয়া যায়। এইভাবেও এবার অনেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়িয়াছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে সতর্কবার্তা দিতে পারিলে অনেক সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। কিন্তু সারা বিশ্বে এখনও টর্নেডোর সতর্কবার্তার তেমন উন্নয়ন হয় নাই। দুর্যোগ মোকাবিলায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হইয়াছে, তবে কার্যক্ষেত্রে শতভাগ সাফল্য আসে নাই। বাংলাদেশের টর্নেডোর একই সময়ে চীনেও অনুরূপ দুর্যোগ আঘাত হানিয়াছে এবং তাহাতে ২৪ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। দুনিয়ার অন্যান্য উন্নত দেশেও প্রায়শ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক। তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান (ইন্নাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির)। তিনি যেমন গড়িতে পারেন, তেমনি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসেরও ক্ষমতা রাখেন। তাহার পরও দুর্যোগ মোকাবিলায় আগে ও পরে যথাসম্ভব সতর্কতামূলক ও তাত্ক্ষণিক উপশমমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। মানবতার বিপর্যয়কালে সকলের যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের যে সব এলাকা অধিক মাত্রায় প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ, সেসব এলাকার ঘরবাড়ির প্রকৃতি ভিন্ন হওয়া দরকার। এই পৃথিবীর কোনকিছুই চিরস্থায়ী নহে। একদিন মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদেরও পরকালের পানে পাড়ি দিতে হইবে। তাই উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার বাড়িঘর অস্থায়ী ভিত্তিতে ও দুর্যোগ প্রতিরোধক হিসাবে গড়িয়া তুলিলে অসুবিধা কোথায়? জাপানের ন্যায় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের বাড়িঘর যদি অতি সাধারণ হইতে পারে, তাহা হইলে আমাদেরগুলি হইলে ক্ষতি হওয়ার কথা নহে। যাহা হউক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই। সেই সঙ্গে আশা করি, সরকারি ও বেসরকারি মহল ক্ষতিগ্রস্তদের পার্শ্বে এমনভাবে দাঁড়াইবেন যাহাতে পরবর্তীতে তাহাদের কেহ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করিতেছেন এমন দুঃসংবাদ আর না পাওয়া যায়। পরিশেষে, আমরা ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতার জন্য আল্লাহতায়ালার দরবারে ফরিয়াদ জানাই।
