স্মরণ

ভাষাসৈনিক রফিক উদ্দিন ভুঁইয়াকে শ্রদ্ধা

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৩, ২১:১০
রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের কাছে একজন পরিচিত নাম। তিনি স্বনামে যেমন পরিচিত, তেমনি ৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন ও ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান এখনো প্রেরণার উত্স। সেইসাথে তার রাজনৈতিক জীবন বর্তমানকালের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অনুকরণীয়। গতকাল ছিল তার ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৯৬ সালের এইদিনে ইন্তেকাল করেন। রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মেরেঙ্গা গ্রামে ১৯২৮ সালের ২৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওয়াফিজ উদ্দিন ভুঁইয়া ছিলেন স্কুল শিক্ষক। মা ফিরোজা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ১৯৪৭ সালে রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া কলকাতা সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে আইএ কোর্স সমাপ্ত করেন। আনন্দমোহন কলেজে ছাত্রাবস্থায়ই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ আত্মপ্রকাশ করে। ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্র সংগঠনটির উদ্যোক্তা শেখ মুজিবুর রহমান ময়মনসিংহ এসে রফিক উদ্দিন ভুঁইয়াকে আহবায়ক ও শামছুল হককে যুগ্ম আহবায়ক করে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করেন। ছাত্রলীগের এ কমিটির মাধ্যমেই মূলত ময়মনসিংহে ভাষা আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫২ সালে রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের শাখাও গঠিত হয়। আনন্দমোহন কলেজের তত্কালীন শিক্ষক প্রফেসর বদরুদ্দিন হোসাইনকে চেয়ারম্যান এবং রফিক উদ্দিন ভুঁইয়াকে সদস্য সচিব (সাধারণ সম্পাদক) করে ২৫৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি হয়। সে সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনে এই ভাষাসৈনিকের জন্মস্থান নান্দাইলে ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপট। তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের রক্তচক্ষু ও প্রশাসনিক খবরদারি ছিল তার নির্বাচনী এলাকা নান্দাইল-ঈশ্বরগঞ্জের সবর্ত্র। এর ভিতর দিয়ে নান্দাইলের দুই ভাষাসৈনিক খালেক নওয়াজ খান, রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া এবং ঈশ্বরগঞ্জের মোসলেম উদ্দিন ও তাদের অনুসারী-সহচররা ছিলেন নেতৃত্বে সোচ্চার। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া দীর্ঘ দেড় বছর কারাবন্দী ছিলেন। সে সময় তার উপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। এরপর ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তার নেতৃত্বে এ অঞ্চলের দামাল ছেলেরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে তিনি নান্দাইল নির্বাচনী এলাকা থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৮৬ সালেও ময়মনসিংহ-৯ নান্দাইল আসন থেকে আবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘকাল ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া নান্দাইল সদরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর সন্তানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭২ সালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজ (বর্তমানে ডিগ্রি) প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের এই নেতা ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া ১৯৯৬ সালের ২৩ মার্চ বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। তাকে ময়মনসিংহ শহরে নিজ বাসভবন প্রাঙ্গণে চিরসমাহিত করা হয়। ময়মনসিংহবাসীর কাছে নীতিবান চরিত্রের মানুষ হিসেবে জননেতা রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া এখনো প্রেরণার উত্স। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন