ইতালির ইতিবাচক সাড়া নাকি ভারতের কূটনীতির জয়

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৩
ভারতের কেরালা রাজ্যের দুই জেলেকে হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে দুই মেরিন সেনাকে শেষ পর্যন্ত ভারতে পাঠিয়েছে ইতালি। ইতালির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফান ডি মিস্টুরার সঙ্গে একটি সামরিক বিমানে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই মেরিন সেনা মাসিমিলিয়ানো লাতোরি ও সালভাতোর জিরোন ভারতে পৌঁছান। মেরিন সেনাদের ফেরত পাঠানোর মধ্যদিয়ে এ দুই দেশের মধ্যে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আপাতত অবসান হয়েছে। ভারতের জোর দাবির মুখে বলা চলে নৌ-সেনাদের না পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছে ইতালি সরকার। আর ইতালির এ পিছু হটাকে বিবেচনা করা হচ্ছে ভারতের কূটনীতিক জয় হিসেবে। এটা গতবছরের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। ইতালির একটি তেলবাহী জাহাজ কোচির কাছাকাছি সমুদ্রে ছিল। তখন একটি ভারতীয় ট্রলার জাহাজটির কাছে আসলে জাহাজে প্রহরারত নৌ-সেনা সদস্যরা ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি চালালে দুই ভারতীয় মত্স্যজীবীর মৃত্যু হয়। এরপর জাহাজটিকে ভারতের বন্দরে নিয়ে আসা হয় আর গ্রেফতার করা হয় দুই সেনা সদস্যকে। ইতালি সরকার প্রথমে বলেছিল ট্রলারটিকে জলদস্যুদের নৌকা ভেবে ভুল করেছিলো সেনারা। পরে তারা বলে, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রে হয়েছে তাই ভারতে সেনা সদস্যদের বিচার হতে পারে না। ভারত ওইসব যুক্তি মানেনি। বরং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার বিচার শুরু করে। গত ডিসেম্বরে বড়দিনের ছুটিতে দেশে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে আদালত ওই দুই সেনা সদস্যকে ছুটি দেয় আর তারা ফিরেও আসেন। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে ইতালির নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য একমাসের ছুটির আবেদন করেন তারা। ভারতে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতের হলফনামায় ছাড়াও পান। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে হঠাত্ই ইতালি জানায়, ঘটনাটা যেহেতু আন্তর্জাতিক সমুদ্রে হয়েছে আর নৌ-সেনাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ হয়ে গেছে তাই ভারতে বিচারের জন্য সেনাদের ফেরত দেয়া হবে না। ভারত চাইলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নিতে পারে। ইতালি সরকারের এই ঘোষণার পর থেকেই দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিতর্ক নতুন মোড় নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মানচিনিকে ভারত না ছাড়ার নির্দেশ দেয় দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। দুই মেরিন সেনা দেশে গিয়ে কেন ফেরেননি, রাষ্ট্রদূতের কাছে তা জানতে চান তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। এছাড়া ভারতে অবস্থানরত ইতালির রাষ্ট্রদূতের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। এ নিয়ে দেশ দু’টির মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা চরম রূপ নেয়। ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের মুখে ইতালির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি পার্লামেন্টে বলেন, যদি তারা প্রতিশ্রুতি না রাখেন,তাহলে ইতালির সঙ্গে সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এরপর ইতালির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা না রাখা নিয়ে পর্যালোচনাও শুরু করে ভারত। সেনা পাঠাতে ইতালির অস্বীকৃতি জানানোর পর ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিরোধী দল ইতালির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছেদের আহ্বান জানায়। অন্যদিকে ইতালি তাদের নাগরিকদের ভারত ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। তবে শেষ পর্যন্ত ইতালি নমনীয় হয়েছে। এ গিঁটবদ্ধ জটিল পরিস্থিতিতে ইতালির সিদ্ধান্ত দুই দেশের নোংরা কূটনৈতিক বিরোধ শান্ত করেছে। গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন টুইটারে লিখেছিলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইতালির সঙ্গে ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা চালানো হয়েছে। ইতালিকে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে মেরিন সেনাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তার এ বক্তব্যের পর অনেকেই প্রশংসা করে মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যকারীদের অনেকেই একে ভারতের কূটনীতির বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কনওয়াল সিবালের মতো কয়েকজন বর্ষীয়ান কূটনীতিকের মতে, মেরিন সেনাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ভারতের বড় বিজয় নয় বরং ইতালির অসময়োচিত, অদূরদর্শী কূটনীতির পর দুঃখ প্রকাশ। ইতালীয়রা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। তারা ভারতের সাড়াকে খাটো করে দেখেছে। কিন্তু যখন দেখল বিষয়টি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না তখনই তারা এটি পর্যালোচনা করতে শুরু করে। যদিও এর আগে মেরিন সেনাদের বীর হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল ইতালি। তিনি বলেন, মেরিন সেনাদের ফেরত না পাঠানোর সিদ্ধান্তে অবশ্যই সরকারের মধ্যে অনেকে একমত ছিলেন না। নইলে ইতালি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতো না। তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা বিশ্বাস করেন, ইতালি এ সংকট আর বাড়াতে চায় না। যদিও তারা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে সাহসী তবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করে বলেছে, এটা ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন। এছাড়া ভারতে ইতালির বিশেষ কিছু স্বার্থের বিষয় রয়েছে, এর মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি অন্যতম। যদিও এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ভারতকেও কিছু আশ্বাস দিতে হয়েছে। যেমন মেরিন সেনাদের সঙ্গে মানবীয় আচরণ করা হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না। তবে ভারতীয়রা বলছে, ইতালির জন্য এ চাপ তীব্র হচ্ছিলো। তাই তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে নৌ-সেনাদের ফেরত পাঠিয়েছে। ইতালির এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কেও অস্বস্তি দূর হয়েছে। ইতালির সাথে ভারতের মূল্যবান সম্পর্ক রয়েছে। এ ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও ইতালির এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা খুশি কারণ ইতালির সরকার ভারতের বিচার ব্যবস্থার মান ও অখণ্ডতাকে সমুন্নত রেখেছে। তবে যতই প্রশংসা করা হোক না কেন দুই দেশের সম্পর্কে যে এক ধরনের তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিছুদিন ধরেই ইতালি ও ভারতের সম্পর্কে অস্বস্তি বিরাজ করছে। সম্প্রতি ইতালি থেকে ১২টি হেলিকপ্টার ক্রয়ের চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ চুক্তি বাতিলের জন্য ভারত সরকারের উপর চাপও রয়েছে। ইতালির ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফান ডি মিস্টুরা বলেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইতালির সরকার সম্ভাব্য কূটনৈতিক সংকট এড়িয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড ইতালীয়দের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় ছিলো। মেরিন সেনারা আমাদের দূতাবাসে রয়েছে। তবে আমরা এখনো বিশ্বাস করি, সেনাদের বিচার হওয়া উচিত ইতালিতেই। তিনি আশা করেন, মেরিন সেনাদের বিচারে দ্রুত একটি বিশেষ আদালত গঠন করবে ভারত সরকার।