মানুষের পৈশাচিকতা যে কি বীভত্স রূপ লাভ করিতে পারে তাহার নিদর্শন বা চিত্র আমাদের দেশে এখন হরহামেশাই দেখিতে পাওয়া যায়। এমন সব নারকীয় উন্মাদনা দৃষ্টে আমাদের প্রাণ কাঁদিয়া ওঠে, চক্ষু অশ্রুসজল হয়। এই জাতীয় ঘটনা যাহারা ঘটায় তাহাদের প্রতি মনে ধিক্কার জাগে এবং তাহাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য দাবিও ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভয়ানক অপরাধীরা পার পাইয়া যায়, আর এখানেই আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আইনের শাসনের দৈন্যদশা স্পষ্ট হইয়া ওঠে। রাজধানীর তেজগাঁ অঞ্চলের এক বস্তিবাসী শিশুকে তাহার সত্ পিতা যেভাবে অত্যাচার করিয়াছে এবং নির্মম পাষণ্ডতায় তাহার দুইটি হাত বটি দিয়া দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছে উহাতে ঐ সত্ পিতাকে দানব বলাই শ্রেয়। অবোধ শিশু শান্তর অপরাধ এই যে, সে সত্ পিতার নিকট চিপস খাইতে চাহিয়াছিল। চিপস কিনিয়া দেওয়া দূরে থাকুক, এই জন্য সে শান্তকে ভর্ত্সনা করিলে শান্ত শুধু অভিমানক্ষুব্ধ চিত্তে অনুযোগ করিয়া বলিয়াছে যে, ‘তুমি আমার পিতা হইয়াও আমাকে কিছুই দিতে চাহ না’। ব্যাস, ইহাতেই সত্ পিতা জাহাঙ্গীরের পৌরুষ বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে এবং ‘ছোট মুখে এত বড় কথা’ শুনিবার মতো শিক্ষা-দীক্ষা,সংস্কৃতি-চেতনা বা ঔদার্য কোনকিছুই তাহার ছিল না। ফলে বিক্ষুব্ধ পৌরুষকে চরিতার্থ করিতে অবোধ শিশুটিকে সে টানিয়া-হ্যাঁচড়াইয়া পার্শ্ববর্তী নির্জন জঙ্গলে লইয়া বটি দ্বারা তাহার দুইটি হাত বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। শুধু তাহাই নহে, ঐ ধারালো অস্ত্র দিয়া শিশুটির শরীরের অন্যান্য স্থানেও যারপর নাই আঘাত করিয়াছে। শিশুটি এই নির্মম আঘাতের পরও কপাল জোরে বাঁচিয়া গিয়াছে।
এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু সম্প্রতি এই পৈশাচিক ঘটনাটি উদঘাটিত হইলে দেশের বিভিন্ন দৈনিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হইয়াছে। শান্ত’র ঘটনার মতো ঘটনা বর্তমানে এই সমাজে আমাদের লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে ঘটিয়া চলিয়াছে। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকাইলে ইহার ক্রমাবনতিই চোখে পড়ে কেবল। নারীর উপর সহিংসতা আর শিশুদের উপর পাশবিক নির্যাতন যেন ক্রমান্বয়েই নৃশংসতার সকল সীমা ছাড়াইয়া যাইতেছে। বিগত কয়েক মাস ধরিয়া দেশের সর্বত্র হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুঠপাট, ডাকাতি, চুরি ইত্যাদির যে বাড়বাড়ন্ত দেখা যাইতেছে উহাতে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় কী! আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা দুর্বৃত্তদের মোকাবিলায় যে খুব একটা কৃতকার্য হইতে পারিতেছে এমনটাও জোর দিয়া বলা যাইবে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষীদের যোগসাজশেই অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক-ফোকর গলাইয়া পার পাইয়া যাইতেছে। শুধু আইন থাকিলেই তো চলে না— আইনের প্রয়োগও থাকিতে হয়। আইনের যদি প্রয়োগ না থাকে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যদি কোন প্রকার স্বার্থান্ধতা, সংকীর্ণ দলবাজি কিংবা অন্য কোন প্রকার লাভালাভের বিষয়ও মুখ্য হয় তাহা হইলে জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতে বাধ্য।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তাপ-উত্তাপ ছড়াইবার পাশাপাশি যখন সমাজ জীবনেও পৈশাচিকতা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয় তখন সকলের মনে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বৃদ্ধি পায় বৈকি! আমরা অবোধ শিশু শান্তর উপর যে ধরনের নির্মমতা নামিয়া আসিতে দেখিলাম উহা কেবল তাহার সত্ পিতার দারিদ্র্য বা আর্থিক অভাব-অনটনের কারণেই যে ঘটিয়াছে এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। বরং ইহার পশ্চাতে এক ধরনের অসুস্থ মানসিকতা কাজ করিয়াছে। আর এমন ধরনের অসুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যাই বুঝিবা আমাদের সমাজে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। সমাজে এত অস্থিরতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় আজ এই ধরনের জঘন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রে প্রণোদনা সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতাবোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ আমাদের চেতনা হইতে যেন কর্পূরের মতো উবিয়া গিয়াছে। এই অবস্থা বিরাজ করিতে থাকিলে সমাজে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া অমূলক নহে। আর সবচাইতে বড় কথা কাহারও পৈশাচিক কর্মকান্ডের বলি যদি শান্তদেরকে এইভাবে হইতে হয় তাহা হইলে সে সমাজকে সভ্য সমাজ বলা যাইবে কি! দরিদ্র মায়ের সন্তান শান্তকে চিরদিনের মতো পঙ্গু করিয়া দেওয়া হইয়াছে, অতএব কিভাবে সে সম্মুখে পড়িয়া থাকা দীর্ঘ জীবন কাটাইবে? সমাজহিতৈষীরা এই হতভাগিনী মা ও তাহার পুত্রের দুঃখ লাঘবে আগাইয়া আসিবে কী!
