আবার জাতিগত দাঙ্গার কবলে মিয়ানমার

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৫০
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত এখনও শুকায় নাই। ইহার মধ্যে আবার সহিংসতা শুরু হইয়াছে আমাদের প্রতিবেশী দেশটিতে। তবে এবার রাখাইন রাজ্যে নহে, মধ্যাঞ্চলীয় মিকতিলা শহরে। গত বুধবার হইতে শুরু হওয়া সেই সহিংসতায় অন্তত ১০ জন নিহত ও ২০ জন গুরুতর আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন হইতে প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই মিকতিলা শহরটি। মুসলিম মালিকানাধীন একটি গয়নার দোকানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৌদ্ধ দম্পতির বাকবিতণ্ডার জের ধরিয়া এই জাতিগত দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। সেখানে চারটি মসজিদ, একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি সরকারি ভবনসহ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছে। সংঘাতে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মৃত্যুও নিশ্চিত করিয়াছে পুলিশ। এদিকে থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের শরণার্থী শিবিরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪২ জন মুসলিম প্রাণ হারাইয়াছেন গত শুক্রবার। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও জানা যায় নাই। আশির দশকে মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাহারা এখানে পালাইয়া আসেন। আমরা এসব মৃত্যুতে শোকাভিভূত। বস্তুত সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সুবিচার না পাওয়ায় আবার একই ঘটনা ঘটিতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। এক হিসাবে দেখা যায়, গত বত্সরের জুন হইতে এ পর্যন্ত সেখানে বৌদ্ধ-মুসলিম সহিংসতায় অন্তত ১৮০ জন নিহত হইয়াছে। আহত হইয়াছে সহস্রাধিক। আর বাস্তুচ্যুত হইয়াছে প্রায় এক লক্ষ ১০ হাজার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে প্রায় ৬ কোটি মুসলিম নাগরিক বসবাস করেন। যদিও গত তিন দশক ধরিয়া কোন আদমশুমারি হয় নাই। আদমশুমারি হইলে মুসলিম জনসংখ্যা আরও বাড়িতে পারে। সেখানকার মুসলমানরা আজ নিপীড়িত ও বৈষম্যের শিকার। ব্যাপক ধরপাকড় ও নির্যাতনের সময় প্রাণ বাঁচাইতে নারী-শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ নৌযানে চড়িয়া বিপজ্জনক সমুদ্রপথে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতেছে। বিশেষত বাংলাদেশে আসিয়া তাহারা নূতন করিয়া আর্থ-সামাজিক সংকটের জন্ম দিতেছে। অথচ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরাইয়া নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের তেমন কোন উদ্যোগ নাই। সারা বিশ্বই আজ অশান্ত। বিশেষ করিয়া অশান্তির লেলিহান শিখা ক্রমশ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দিকে ধাবিত হইতেছে। এই রকম পরিস্থিতিতে সবচাইতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপনীত হইয়াছে সংখ্যালঘু মানুষরা। চীন ও মিয়ানমারে মুসলমনেরা নির্যাতিত হইতেছে। তাহার ঢেউ আসিয়া লাগিতেছে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হইতেছে। কোন না কোনভাবে তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে বাংলাদেশেও। আবার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে বলির পাঠা বানানো হইতেছে। আসলে ইহার পিছনে রহিয়াছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও উচ্চাভিলাষ। আছে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ। অথচ আমরা গণতান্ত্রিক আদর্শে সঠিকভাবে উজ্জীবিত হইলে কে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কে সংখ্যালঘু, কে মুসলমান আর কে হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ, রাষ্ট্রে সেই পরিচয় কখনও বড় হইয়া দেখা দিত না। মিয়ানমারে গণতন্ত্র চর্চার অভাব ও দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনই জাতিভেদ ও সংঘাতকে উসকাইয়া দিয়াছে। ইহাতে প্রতিবেশী দেশ হিসাবে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন। আশা করি, শীঘ্রই এই দুঃখজনক পরিস্থিতির অবসান হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন