আপনদর্পণ

যেন এক বনস্পতি, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৫১
আমার আকাশ আজ মেঘলা। বেদনার ভারি মেঘ দু’চোখে নেমেছে আজ এখনি নামবে আঁধার। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিধারার মতো সজল হয়ে উঠছে দু’নয়ন। মনের ভেতর জাগছে সুতীব্র এক হাহাকার। কী যেন হারিয়ে ফেললাম, নিঃস্ব হয়ে গেলো আমার মনোলোক। এই দুঃখ, এই বেদনা আমার একার নয়, শত শত লোকের, যারা বাংলাদেশি, যারা দেশকে ভালোবাসেন স্বার্থহীনভাবে। গত ৬ই চৈত্র, ১৪১৯, ২০শে মার্চ, ২০১৩ অপরাহ্ন ৪টা ৪৭ মিনিটে জগতের মায়াডোর ছিন্ন করে অসীম জগতে পাড়ি দিলেন তিনি। আমাদের অতি প্রিয় অতি কাছের মানুষ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান। এ দেশের দল মত নির্বিশেষে সকলের কাছে তাঁর ছিলো একটি শ্রদ্ধার সিংহাসন, যেখানে আসীন থেকে শত দুর্যোগেও বিচলিত হননি তিনি, তাঁর সরল মুখে সহজ হাসিটি সবসময়ই ছিলো সজীব। ৯ই মার্চ তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম তাঁর চতুর্থ বর্ষ পূর্তি উত্সবে শ্রদ্ধা জানাতে। এমনকি এবারের বইমেলায় ‘উচাটন মন ঘরে রয় না’, সদ্য প্রকাশিত বইটি নিজে গিয়ে তাঁর হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম। সব ইচ্ছাই অপূর্ণ থেকে গেলো। অথচ এক্ষুণি তো বিদায় নেয়ার মুহূর্ত ছিলো না তাঁর। কিশোরগঞ্জে ভৈরব উপজেলার ভৈরবপুর গ্রামে ১৯২৯ সালের সুন্দর একটি ভোরে জন্ম নেন যে শিশুটি বাবা মেহের আলী মিয়া ও মা বাচ্চু বিবির গৃহে, শৈশব থেকেই আইনজীবী পিতার আদর্শে বড় হয়ে উঠে তাঁর মধ্যে শিকড় বাঁধে দেশপ্রেমের অঙ্কুর। দিনে দিনে রাজনীতির অঙ্গনে ৬০ বছরের অধিক সময় তিনি যাপন করেছেন দেশের মঙ্গলকার্যে। কী অসাধারণ মমতাময় সরল একটি হূদয়, আমাদের মতো সাধারণজনকেও তিনি কাছে টেনে নেন তাঁর স্নেহের যাদুস্পর্শে। এ বছর কোরবানীর ঈদে বঙ্গভবনে গেলাম সালাম জানাতে। সারিবদ্ধ দর্শনার্থীর ভিড়ে দূর থেকেও চিনে নিলেন তিনি। ডেকে নিলেন কাছে, দু’তিন মিনিটের কুশল বিনিময়ের ফাঁকে জানতে চাইলেন নতুন কোন বই লিখেছি কিনা। আমি সলজ্জ হেসে জবাব দিলাম ‘লিখবো ভাই এবং প্রকাশিত হলে আপনাকে পৌঁছে দেবো’। আমাদের দেশে লেখকের কোন অভাব নেই, পাঠক হয়তোবা কিছুটা কম। আমি বই প্রকাশ হলে বন্ধুদের, আত্মীয়দের, স্বজনদের উপহার দিই। পড়েন তারা, দু’একজন সে কথাটি জানান, বেশিরভাগই থাকেন নিশ্চুপ। তাই দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির কাছে যখন শুনতে পাই তাঁর ভালো লাগার কথা, মনটি ভরে উঠে একসমুদ্র ভালো লাগার ঢেউয়ে। জানি না এমন একজন রাষ্ট্রপতি ভবিষ্যতে আমরা পাবো কিনা, যিনি ক্ষমতার মসনদে বসেও পদমর্যাদা ভুলে সকলকে ডেকে নেন আপনজনের মতো, হয়ে উঠেন ঘরের মানুষ। বনস্পতির মতো মমতার শাখা-প্রশাখা বিস্তারিত ভূমিকা তাঁর। সে জন্যেই প্রতিটি ঘরে তাঁর জন্যে রয়েছে শ্রদ্ধার আসন। আমার ঘরে গতকাল থেকেই দুঃখের হাওয়া। আট বছরের নাতি, বারো বছরের নাতনি, কন্যা, জামাতা, গৃহকর্তা, সকলেই দুঃখিত মনে দোয়া করছেন। খবরটি প্রথম পাই সুদূর মায়ামী থেকে বড় কন্যার মারফত। তাঁর তখন মধ্যরাত, আমাদের শেষ বিকেল। ও জানে আমার মনের খবর। বাড়ির সকলেই জানেন তিনি আমার কাছে কতো প্রিয় ছিলেন। যেন পরম সুহূদ, স্নেহময় সহোদর, অথবা মঙ্গল চিন্তায় উদ্বিগ্ন অভিভাবক। কেমন করে কতো দিনে এই বন্ধন গড়ে উঠেছে আমার জানা নেই, জানি সবটুকুই তাঁরই গুণে। বেহেশেতর পুষ্পকাননে যেন ঠাঁই হয় তাঁর, করুণাময়ের কাছে এই বিণীত প্রার্থনা। আমাদের দেশ যেন সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হয় মরহুম রাষ্ট্রপতির এই স্বপ্ন আমাদের সফল করতে হবে। শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রেষ্ঠ উপায় কর্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠা করার প্রতিজ্ঞা আমাদের। ঘরে ঘরে শিক্ষার দীপ জ্বালা, ক্ষেত-মাঠ ফসলে পূর্ণ করে তোলা, পথ চলায় নিরাপদ রাস্তা পাওয়া সকলের প্রাথমিক দাবি। সেই দাবি পূরণে আমরা এগিয়ে যাবো। লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]