‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’—

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৩, ২১:০৯
‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়’—কবির এই অন্তর্ভেদী আক্ষেপের মধ্যেই স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা ও উহার মর্মবাণী সুপ্ত হইয়া রহিয়াছে। আমাদের জাতীয় জীবনের পঞ্চাশ-ষাট বত্সর পূর্বের প্রতি যদি দৃষ্টিক্ষেপ করা যায় তাহা হইলে এতদঞ্চলের সংগ্রামী মানুষদের মনে কবির এই অন্তর্জ্বালা এবং উহার ক্রন্দনরোল একটু কান পাতিলেই শুনিতে পাওয়া যায়। আমরা ৪২ বত্সর পূর্বে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যদিয়া মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনের জন্য দুনিয়ায় এক নজিরবিহীন ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়িয়া তুলিয়াছিলাম। সেদিন সকলের কণ্ঠেই বজ নির্ঘোষে স্বাধীনতা ও মুক্তির দাবিই উচ্চারিত হইয়াছে। আমাদের রাজনৈতিক মুক্তির দিশারীরূপে যে সকল ক্ষণজন্মা পুরুষ সেই পঞ্চাশ ও ষাট দশকে আমাদের সম্বিত ফিরাইতে অকুতোভয়ে নেতৃত্ব দিয়াছেন তাহারা প্রাত:স্মরণীয়। ষাটের দশকের মধ্যভাগে ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যদিয়া বাঙলার মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির চেতনা এমনই প্রবল রূপ ধারণ করে যে, একাত্তরের মোহনায় পৌঁছাইয়া উহা বারিধির মহাকল্লোলের রূপ ধারণ করে। একাত্তরের মার্চে বাংলাদেশ ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলিয়া উঠিয়া অগ্নিস্রাব বর্ষণ করিয়াছে দখলদারদের কবল হইতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। এদেশের লক্ষ লক্ষ হলাহলশিখ-ভুজগ শিশুর দল সেদিন তাহাদের সঞ্চিত বিষ ঢালিয়া দিয়াছে জালিমের চোখেমুখে। উহাদের অগ্নিজিহ্বা লক্ লক্ করিয়া নাচিয়া বেড়াইয়াছে, আকাশ পাংশু বর্ণ ধারণ করিয়াছে, বাতাস রাঙ্গিয়া উঠিয়াছে। মাতা, জায়া ও ভগ্নির সম্ভ্রম বাঁচাইবার এবং পুত্র-কন্যার জীবন রক্ষার জন্য বাংলার তপ্ত-তাজা তরুণদের আত্মবিসর্জনের হিড়িক পড়িয়াছিল সেদিন। তেইশ বত্সরের শোষণ-বঞ্চনা অত্যাচারের হিসাব কড়ায় গন্ডায় আদায় করিয়া লইবে এই ছিল তাহাদের পণ। জাতিকে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির ছক আঁকিয়া দিতে সেদিন আমরা আত্মোত্সর্গের মহোত্সবে মাতিয়া উঠিয়াছিলাম। কিন্তু সে মুক্তি এই ৪২ বত্সর পরও কেন সুদূরপরাহত বা অধরা রহিয়া গিয়াছে, উহাই বুঝিবা সর্বাপেক্ষা বড় প্রশ্ন আজ। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের জাল ছিন্ন করিয়া স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ অর্জনের স্বপ্ন এই জাতির মুক্তিদাতারা দেখিয়াছিলেন সে বাংলাদেশ কি আমরা সত্যি সত্যিই হাসিল করিতে পারিয়াছি? ৪ দশকাধিক কাল পরও আমাদের স্বাধীনতা স্থিরতা লাভ করিতে পারিতেছে না কেন? কি কারণে এই অস্থিরতা আমাদের? একাত্তরে এ দেশের ডান-বাম-দক্ষিণ বা উগ্রপন্থি সকল মানুষই এক মোহনায় দাঁড়াইয়া দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য অকুতোভয়ে লড়িয়াছে। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই ঔপনিবেশিক আমলের শাসন ব্যবস্থা বজায় রাখা তথা ঐ একই প্রশাসন ও আইন কানুন দ্বারা দেশ শাসনের যে উদ্যোগ চলিয়াছিল উহার পরিণাম যে ভাল হয় নাই তাহা আজ জাতি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতেছে। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের নব চেতনায় উদ্ভাসিত ও উজ্জীবিত জাতিকে স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণভাবে আগাইয়া লইতে তথা ধ্বংসের বুকে সৃষ্টির নব পূর্ণিমাকে আমরা অস্ত আকাশের অলিন্দে জাগাইয়া রাখিতে পারি নাই। একাত্তরে মুক্তির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের মৌলিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এত ত্যাগ, এত তিতিক্ষা, এত সম্পদহানি, বীরের এত রক্তস্রোত, মাতার এত অশ্রুধারা, ভগ্নির এত আহাজারি সবই কি আজ ধরার ধুলায় হারাইয়া যাইতে বসিয়াছে? একাত্তরে স্বপ্ন পূরণের এক মাহেন্দ্রক্ষণ সমুপস্থিত হইয়াছিল আমাদের সামনে। বিশ্বসভায় নিজেদেরকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান এক জাতিসত্তায় রূপান্তরের সুযোগকে আমরা আজও সঠিকভাবে কাজে লাগাইতে পারিয়াছি কি? তবে কি আমাদের এই অর্জিত স্বাধীনতা কেবল রাজা বা শাসকের পরিবর্তনের মধ্যেই আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে? আমরা ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করিলাম, স্বতন্ত্র পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত পাইলাম বটে, কিন্তু স্বাধীনতা নামক মহার্ঘ বিষয়টিতো আমাদের নিকট আজও স্পষ্ট হইল না। দেশভাগ আর ‘৭১ এর স্বাধীনতার মধ্যে মৌলিক ও গুণগত পার্থক্য কি সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন করিয়া চোখে পড়ে? আমরা আইনের শাসন আর গণতন্ত্রের নামে মুখে খই ফুটাইলাম অথচ উহাদের কোন প্রকার চর্চা, অনুশীলন বা পরিচর্যা করিয়াছি এমন দাবি জোর গলায় করিতে পারিব সে ভরসা মিছে! এই বিয়াল্লিশ বত্সরে দেশবাসীর খাওয়া, পরা, বাসস্থান, চিকিত্সা ইত্যকার মৌলিক দাবিসমূহও যদি মিটাইতে পারিতাম তাহা হইলে তাহাদের আত্মার খোরাকও হয়তো অনেকটা পূরণ হইতো। অর্থাত্ তাহাদের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইন ও ন্যায়ের শাসন, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ক মানসিক খোরাকসমূহ নিশ্চিত করা হয়তোবা সহজতর হইতো! দীর্ঘ পথ পরিক্রমণের পর কেহ যদি আমাদেরকে আজ জিজ্ঞাসা করে, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’? তাহা হইলে উহার কোনো সদুত্তর আদৌ আমাদের নিকট আছে কী?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন