মুক্তিযুদ্ধ

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং কিছু কথা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৩, ২১:১১
নৈসর্গিক রূপ, কল্পচিত্র আর মানুষের বিচিত্র চিন্তা-চেতনা লিপিবদ্ধ করার কাজটি বেশ কঠিন। আর গণিতশাস্ত্র, ব্যাকরণ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভবত কঠিনতর কাজ। কিন্তু মানুষের হূদয় যে এক বিশাল ক্যানভাস। এই হূদয়, মা-মাটি-মানুষ নিয়েই আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ। এ দেশের মেঘনাপাড়ে সম্ভ্রান্ত এক বাঙালি কৃষক পরিবারে জন্মেছি আমি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির জন্য অহংকার ও মাথানত না করার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ক্যানভাস। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি-আমরা, সকলেরই গর্ব তাই ’৭১-এর জয়যাত্রার আবেগ দমিয়ে রাখতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু লেখার কথা আমাকে বলা হয়েছে অনেকবারই। কিন্তু লিখতে পারিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক শিষ্টাচারবর্জিত আচরণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে। সত্য কথা লেখা যে কত কঠিন তার জীবন্ত সাক্ষী আমি নিজেই। এখানে বলে রাখি, ১৯৭১ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমার নিজ জেলা চাঁদপুরে। মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখতে হলে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সত্য-সঠিক কথা লিখতে হবে, কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তিযুদ্ধের জয়যাত্রার পক্ষে নয়। আমরা বাঙালিরা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজব্যবস্থার জন্য। বাংলার ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতার এবং জাতির মুক্তির এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দুরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নির্ভীক ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার দরকার এবং অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, যার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই। পৃথিবীর যতগুলো দেশ স্বাধীন হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিরই নেতৃত্বে ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক অবিসংবাদিত নেতা। তেমনি বাঙালি জাতির একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন: “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। তিনি এমনও বললেন- আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারি, আদালত, ফৌজদারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেক্রেটারিয়েট সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।” ঠিক তাই হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ই ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল আবদুর রহিম ও তার কিছু বেঁচে যাওয়া সৈন্যদের নিয়ে ঢাকা অভিমুখে জলপথে পলায়ন করে। চাঁদপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পতন ঘটে ৭ই ডিসেম্বর ভোররাতে অর্থাত্ ৮ই ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর সূর্য উদয়ের আগেই। এখানে একটি কথা অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের চাঁদপুরের মেঘনাপাড়ের বাঙালি মা ও বোনেরা, বাবা-ভাইয়েরাসহ সর্বস্তরের মানুষই আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়াও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে হাজার হাজার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, সম্পদ লুটপাট করেছে, হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করেছে এবং প্রায় ৭০-৮০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারা কেউ ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলের কেন্দ্রীয় নেতা হবেন কিনা জানি না। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে করি যারা চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন সেসব মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় সংসদে মনোনয়ন দেয়া উচিত। জাতীয় রাজনীতিতে এবং জেলার রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মানজনক অবস্থান (পদবী) দেয়া দরকার। জাতীয় স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের মহিমার অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে মুক্তিযোদ্ধা বীর জনতাকে আবারো ঐক্যবদ্ধ হতে হবেই। আমরা সকল স্তরের মুক্তিযোদ্ধারাই মহান মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের অবদানকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক, সত্য ও গৌরবগাঁথা ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের জাগানীয়া স্মৃতির প্রকৃত সত্য তথ্য তুলে ধরতে পারিনি, জানাতে পারিনি আমরা, সম্ভবত এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা ইতিহাস জাগানীয়া স্মৃতিকথার বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানাচ্ছি। অমর হোক আমার দেশ, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত জন্মভূমি বাংলাদেশ। লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ