দেশে অধিকাংশ পণ্যই আমদানি করিয়া চাহিদা মিটাইতে হয়। চাল, ডাল, তেল, নুন হইতে শুরু করিয়া আমরা প্রায় সকল প্রকার পণ্যই আমদানি করিয়া থাকি। এমনকি তৈরি পোশাক রফতানি করিয়া আমরা বিদেশি মুদ্রা আয় করি। তথাপিও কোন কোন দেশ হইতে স্বল্প পরিমাণে হইলেও তৈরি পোশাক আমদানি হইয়া আসে। ঢাকার বিভিন্ন শপিং মলে এইরকম চিত্র সহজেই চোখে ভাসিয়া ওঠে। যদিও সেইসব শুধুমাত্র ফ্যাশন সচেতন মানুষদের জন্য। কিন্তু সাধারণ জনগণের তাহাতে কিছু আসে যায় না। সাধারণ মানুষের জন্য দরকার শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী। এই সব পণ্য আমদানি না হইলে ষোলো কোটি মানুষের এই দেশে চাহিদার চাপ সামাল দেওয়া কঠিন কাজ হইত। আমদানির উপর এতটা নির্ভরশীল হইয়াও আমরা মাঝেমধ্যে সংকটে পড়িয়া যাই। সরবরাহ ব্যবস্থা সঠিকভাবে না চলিলে এই সংকট সৃষ্টি হইয়া থাকে। যাহা বাজারে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াইয়া দিতে পারে এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়াইয়া দেয়।
এক সময়ের কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রধান শস্য চাল হইতে শুরু করিয়া অন্য শস্যাদির ভাল ফলন হইত। সময়ের পরিবর্তন কিংবা চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে কৃষির উত্পাদনে ভিন্নতা আসিয়াছে। কমিয়াছে চাষাবাদের জমিও। অনেকে বেশি ফলনের আশায় উচ্চফলনশীল ধান চাষের দিকে ঝুঁকিয়াছে। এই সব কারণে বর্তমানে ধান উত্পাদনে আমরা বেশ আগাইয়া থাকিলেও অন্যান্য পণ্য উত্পাদনে বেশ খানিকটা পিছাইয়া আছি। যাহার কারণে অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য এখনো আমাদেরকে আমদানি করিতে হয়। এখন প্রশ্ন হইতেছে, আমদানি নির্ভরতার কারণে আমরা সরবরাহ সংকটে পড়িয়া যাই কি না।
এই কথা ঠিক যে, আমদানিনির্ভর যখন হইয়া উঠিয়াছি তখন আমদানি কমিয়া গেলে সরবরাহ সংকট দেখা দিবে ইহাই স্বাভাবিক। তাই আমদানি ঠিক রাখিয়া সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করিতে পারিলে সংকট সৃষ্টি হইবে না। সমপ্রতি খবর প্রকাশিত হইয়াছে যে, দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমিয়া গিয়াছে। ভোগ্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা চলিতেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলি যদি সচেতন হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই ধরনের সংকট সৃষ্টি হইতে পারে না। কারণ, সরকারেরও বিকল্প ব্যবস্থার কথা মাথায় থাকিতে হইবে। শুধু আমদানিকারকদের উপর নির্ভর করিয়া বসিয়া থাকা ঠিক হইবে না। আমদানিকারকদের নানান রকম সুবিধা-অসুবিধা থাকে। তাহারা মুনাফার আশায় ব্যবসা করিয়া থাকে। মুনাফা কম হইলে আপনা আপনিই ব্যবসা গুটাইয়া নিবে-এমনটাই স্বাভাবিক। কিংবা কেহ ইচ্ছা করিল যে, আর আমদানির কাজটি করিবে না, তাহাতেও কোন সমস্যা নাই। তাহার বাধ্যবাধকতার কিছু নাই। কিন্তু যাহারা জনগণের সেবা করিবার ব্রত নিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়াছেন, তাহাদের জন্য অবশ্যই ইহা চিন্তার বিষয়। তাই তাহারা বিকল্প ব্যবস্থা রাখিবেন অবশ্যই।
তদুপরি, বেসরকারি আমদানিকারকদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রহিয়াছে। ব্যাংক যদি তাহাদেরকে অর্থায়ন করিতে না চায়, এলসি খুলিয়া না দেয়, তাহা হইলে ঐ আমদানিকারকের কিইবা করিবার থাকে। বর্তমানে ব্যাংকগুলিকে অনেক বেশি নিয়ম-শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইতে হইতেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে রহিয়াছে তারল্য সংকট। ইহাতে ব্যাংকগুলির এতই ত্রাহি অবস্থা যে, তাহাদের আগের মতন সহজেই এলসি খুলিবার বিষয়টি এখন আর নাই। নানান হিসাব-নিকাশ করিয়া ব্যাংক আমদানি খাতে অর্থায়ন করিয়া থাকে। আবার এলসি খুলিলেই হইবে না, পণ্য আসুক বা না আসুক ষাট দিনের মধ্যে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি শোধ দিতে হইবে। ষাট দিন অতিবাহিত হইলেই তাহা খেলাপির আশংকায় বিশেষ হিসাবের (এসএমএ) খাতায় চলিয়া যাইবে। কিন্তু বাস্তবে এলসি খুলিয়া, বন্দরে পণ্য আনিয়া তাহা বাজারজাত করিয়া, বিনিয়োগকৃত টাকা পকেটস্থ করিতে ষাটদিন কি যথেষ্ট? আমদানিকারকদের সেই প্রশ্নেরও জবাব থাকা বাঞ্ছনীয়।
