গত ১২ মার্চ সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও দুই বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ক্যাপসুলের সঙ্গে একটি কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী কয়েকটি শিশুর মৃত্যু এবং কয়েক হাজার শিশুর অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বাংলাদেশে কিছু কোম্পানি এ ধরনের ওষুধ অনেক বছর যাবত্ বাজারজাত করে আসছে। তবে ইতিপূর্বে এ ধরনের মৃত্যু বা অসুস্থ হওয়ার খবর চোখে পড়েনি। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই বি. এ. এস. এফ (জার্মান কোম্পানি) থেকে কাঁচামাল আমদানি করে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল তৈরি করে থাকে। কোম্পানিগুলো স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অনেক উন্নত দেশেও এসব ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। প্রশ্ন হলো—তাহলে ১০ কোটি ক্যাপসুল সরবরাহের কাজটি বাংলাদেশের কোন কোম্পানিকে না দিয়ে কেন ভারতের অলিভ নামের অতি সাধারণ মানের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে দেয়া হলো। ভারতের অনেক ভাল কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও কেনইবা তারা দরপত্রে অংশগ্রহণ করেনি। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী ভারতের অলিভ, কানাডার ব্যানার ও বাংলাদেশের গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস দরপত্রে অংশগ্রহণ করে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে অনেকটা লুকোচুরির করে অলিভকে কাজটি দেয়া হয়।
ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল তৈরি করার লাইসেন্স বিশ্বমানের অনেক বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিরই রয়েছে। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো প্রায় ৯০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে অথচ নিজের দেশের শিশুদের জন্য ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল তৈরির দক্ষতা নেই? (!) স্থানীয় কোম্পানিগুলো যেখানে একটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ৬ টাকায় (২০০,০০০ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট) প্রস্তুত করতে সক্ষম সেখানে কার স্বার্থে কি উদ্দেশ্যে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে অলিভ নামের কোম্পানিটি থেকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্রয় করা হলো।
ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী (১৭/৩/২০১৩) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহের জন্য দরপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান যাচাই এবং সর্বশেষ ক্যাপসুল সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ। সরকারের প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতীয় অলিভ কোম্পানির নামে বিভিন্ন নিম্নমানের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করেছে বলে বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়। ১২ মার্চের আগেই ওষুধের মান নিয়ে যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিপোর্ট আসতে থাকে তখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দুই দফায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত একাধিক পরীক্ষাগারে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান পরীক্ষা করে। বলা হয়, এসব ক্যাপসুল মানসম্পন্ন, জীবাণুমুক্ত ও নিরাপদ। তবে পরীক্ষাগারগুলোর নাম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। এতকিছুর পরও যখন অলিভের নামে স্থানীয় একটি কোম্পানির নিম্নমানের ওষুধ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে সংবাদকর্মীরা নিশ্চিত হতে পেরেছে, তখন প্রভাবশালী মহলের লুটপাট, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি সাধারণ নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এ ব্যাপারে তারা এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
তবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়ে এ ধরনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা এবারই প্রথম নয়—সরকারের দ্বিতীয় বছরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। ওষুধের মান ও খাওয়ানোর সময় নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল। এ ধরনের ওষুধ খাওয়ানোর উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল। জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় জানুয়ারি মাসে অর্থাত্ শীত মৌসুমে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর জন্য। এর ভিত্তিতে ৫ জানুয়ারি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর দিন নির্ধারণ করা হয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন আসার ফলে তারিখ পিছিয়ে ধার্য করা হয় ১২ মার্চ। দেশের স্বার্থে সরকার দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। আর এ কাজটি যতদ্রুত হবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল। এক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যে অতীব জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক :অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল:[email protected]
