রাজনৈতিক ঐক্যে সংলাপ ও সমঝোতার বিকল্প নেই

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২১:০০
রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন তীব্র বিভেদ, দোষারোপ চলমান তখন রাষ্ট্রপতির চিরবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার সময় সকল রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত শ্রদ্ধা নিবেদন ঐক্যের এক নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছে বললে ভুল হবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর খোদ বিরোধীদলীয় নেতা যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন তা এক কথায় অনন্য এবং রাজনীতিতে এটি সুবাতাসের লক্ষণ। এই ধারাবাহিকতায় অনেকদিন পর টেলিভিশনের পর্দায় দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছাকাছি বসতে এবং আলাপচারিতা করতে দেখা গেছে। তবে সবার প্রত্যাশা ছিল শোকের এই ক্ষণে দুই নেত্রী হয়ত কিছুটা হলেও কূশল বিনিময় করবেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়নি। সেটা হলে আরো ভালো হতো। দেশের মানুষ সেই কবে থেকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছেন— দুই নেত্রীর দেখা হবে, কুশল বিনিময় হবে, তারা হাসাহাসি করবেন—এরকম দৃশ্য দেখার জন্য। কিন্তু এবারও তা হলো না। ২১ মার্চ বঙ্গভবনের একই ছাদের নিচে শোককাতর দুই নেত্রী প্রায় কাছাকাছি এলেও কথা হয়নি। দুইজনের মধ্যে এদিন কথা হলে সত্যি রাজনীতির ইতিহাসে অন্যরকম দিনের সূচনা হতো। প্রসঙ্গত বলতে হয়, সর্বশেষ দুই নেত্রীর মধ্যে কুশল বিনিময় হয়েছিল ২০০৯ সালে সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবসে। এরপর গত বছর সেনাকুঞ্জে দুইজনের মধ্যে দেখা হলেও কথা হয়নি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আমাদের রাজনীতির বড় এক মাইনাস দিক দুই নেত্রীর মধ্যে দেখা-সাক্ষাত্, কুশল বিনিময় না হওয়া। পৃথিবীর কোনো দেশেই জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে এরকম বিভেদ আছে বলে দৃশ্যমান নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের রাজনীতির একটি অন্যতম কুসংস্কৃতি অন্যের মতকে গুরুত্ব না দেয়া। যার প্রতিফলন আমরা দেখি জাতীয় সংসদেও। এ কারণে আমাদের জাতীয় সংসদ এখনও কার্যকর হয়ে উঠেনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল বিষয়-সংসদকে ঘিরেই আবর্তিত হবে সবকিছু। সরকারি দল, বিরোধী দল সবারই জবাবদিহিতার জায়গা হবে জাতীয় সংসদ। যেখানে মাননীয় সংসদ সদস্যদের ভোট দিয়ে জনগণ পাঠিয়েছে। সংসদীয় সকল কার্যক্রমে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু ঠিক এর উল্টোটা আমরা দেখি। খুব সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে আমাদের দেশটিতেই সবচেয়ে অকার্যকর জাতীয় সংসদ। সরকার গঠনের প্রথম কয়েকমাস জাতীয় সংসদ সবার অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত থাকলেও তার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় দ্রুতই। যখন যারা বিরোধী দলে থেকেছেন তারা হঠাত্ করেই প্রাথমিক অবস্থায় ওয়াকআউট শুরু করেন। এরপর আস্তে আস্তে তা গড়ায় ধারাবাহিক সংসদ বর্জনে। গত দুই দশক ধরে আমরা এই একই চিত্র দেখে আসছি। কিছুদিন আগে এটিএন বাংলার মক পার্লামেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন দেশবরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক। সেখানে তিনি বক্তব্য প্রদানের সময় ঢের আক্ষেপ করছিলেন এই বিষয়টি নিয়ে। তাঁর বক্তব্যের নির্যাস ছিল এরকম-সংসদ অকার্যকর হলে গণতন্ত্র কোনোভাবেই শক্তিশালী হয় না। তাঁর মতে, তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা সবই হতে হবে জাতীয় সংসদে। সরকারের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদকাল আর বেশি নেই। একটি নতুন দিন মানেই মহাজোট সরকারের আয়ুর ক্রমশই ফুরিয়ে আসছে। চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে নতুন নির্বাচনের প্রতিধ্বনি। একটা বিষয় স্পষ্টত বুঝি, বাংলাদেশের জনগণ যতোই দুই বা তিন ভাগে বিভক্ত থাকুক না কেন সবারই কিন্তু প্রত্যাশা সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। নব্বই-এর অভ্যুত্থানের পর ৯১ সালে যে চমত্কার নির্বাচনটি হয় তারপর থেকেই মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস অটুট হয়ে দাঁড়ায়। ’৯১-এর পর ’৯৬ এবং পরবর্তীতে ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই প্রথা বাতিল করা হয় এবং আগামীতে দৃশ্যত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের সমস্ত আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে বিএনপি কোনো অবস্থাতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োজন আছে কী নেই এই বিতর্ক রাত-দিন করা অনর্থক বা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তবে স্বাভাবিক দৃষ্টি বা বিবেচনায় বুঝি সবকিছুর একটা বাস্তবতা আছে। সেই বাস্তবতায় এটাই সঠিক যে, বাংলাদেশের মতো দেশে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন কোনোভাবেই নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যা নব্বই পরবর্তীতে প্রমাণিত সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ নতুন আইন প্রণয়ন করে গোটা দেশকে এক মহাবিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপি স্পষ্টত ঘোষণা করেছে তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন করবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তাদের অনুসারীদের নিয়ে বিএনপি এই নির্বাচন শুধু বর্জন নয়, প্রতিরোধও করবে। বিএনপি আন্দোলনের মাঠে সেভাবেই এগুচ্ছে। এদিকে সরকারের যে দৃষ্টিভঙ্গি তাতে করে মনে হচ্ছে সরকার এই ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়। দেশজুড়ে যখন সরকারি দল ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর নিপীড়ন আর নির্যাতনের উত্সবে মত্ত তখন রাষ্ট্রপতির প্রয়াণে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় সব দলের নেতাদের সম্মিলিত বিদায়ী শ্রদ্ধার্ঘ কিছুটা হলেও জাতীয় রাজনীতিতে এক ঐক্যের সূচনা করেছে। এই মুহূর্তে চারপাশ থেকেই জোর দাবি উঠেছে প্রধান দুই দলের মধ্যে ইতিবাচক সংলাপ হওয়া প্রয়োজন। সবার মুখেই এখন জাতীয় ঐক্যের কথা। গণমাধ্যমও এখন এ বিষয়ে সরব ভূমিকা পালন করছে। জাতীয় ঐক্যের যে আহবান তার মূল বিষয়- সবকিছু আলোচনা এবং সমঝোতার ভিত্তিতেই হতে হবে। কোনো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না, যাতে করে কোনো তৃতীয় শক্তির আগমন ঘটতে পারে। গত কয়েকমাস ধরে সাধারণ জনগণ দেখেছে রাজনীতির নামে এখন যা চলছে তা সেই পুরোনো চিত্রই। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। বিরোধী দল যেমন আন্দোলনের ঘোষণা দিচ্ছে, ঠিক তেমনি সরকারি দলও শক্ত হাতে সবকিছু দমন করা হবে বলে হুংকার ছুঁড়ছে। সেই ধারাবাহিকতায় সারাদেশে গণগ্রেফতারের ঘটনা চলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকেই সংলাপ, আলোচনা, সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। একই সাথে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এ কারণেই বিরোধী দলকে সংলাপে আসার পরিবেশ সরকারকেই তৈরি করতে হবে। লোক দেখানো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে। যে কথা আগেই উল্লেখ করেছি রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে যে সৌন্দর্যের অবতারণা করেছেন তা এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব এখন সরকারের। সবশেষে বলবো, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের প্রয়াণের ঘটনায় রাজনীতির ময়দানে যে ঐক্যের ডাক উঠেছে সেই ঐক্য, সমঝোতা করার ইতিবাচক পরিবেশ ক্ষমতাসীন দলকেই তৈরি করতে হবে। না হলে আবার রক্তপাত, জীবনহানি কেবলই প্রতিহিংসার পথ তৈরি করবে—যে পথ সাধারণ জনগণের কাছে একেবারেই কাম্য নয়। শান্তিপ্রিয় জনগণ শান্তিতে বাঁচতে চায়। লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন