ওবামার মধ্যপ্রাচ্য সফরের গুরুত্ব

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৩, ২১:২৫
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে তিনদিনের ঐতিহাসিক সফর শেষ করেছেন। যদিও নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ওবামার সফর সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করেছেন, “ওবামা সম্ভবত প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি পর্যটকের মতো ইসরাইল সফরে গেছেন।” আমরা বুঝতে পারি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধার রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শুধুমাত্র পর্যটকের বেশে বা পর্যটনের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দু্ই অশান্ত প্রতিবেশী দেশ সফরে যাবেন না। দুই দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে তার আলোচনায় যেসব তথ্য উঠে এসেছে সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরাইলি নেতাদের ওপর চাপ দিতে দেশটির জনগণের কাছে সরাসরি আবেদন জনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সত্যিকারের নিরাপত্তার একমাত্র পথ হচ্ছে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা । তিনি আরও বলেন, “যখন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার কোন শাস্তি হয় না, সেটা ন্যায়বিচার নয়। ফিলিস্তিনিদেরক নিজস্ব জমিতে চাষাবাদ করতে বাধা দেওয়া হবে, একজন শিক্ষার্থীকে পশ্চিম তীরের যে কোন এলাকায় বিচরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে অথবা নিজ বসতবাড়ী থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করা হবে, এসব ঠিক নয়। দখল বা নিয়ন্ত্রণ কোনটিই সঠিক কাজ নয়। নিজস্ব ভূমিতে ইসরাইলের যেমন রাষ্ট্র গঠন করার অধিকার আছে, ফিলিস্তিনিদেরও তেমনি আছে। একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা ও সমৃদ্ধশালী হতে ইসরাইলের জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে একটি স্বাধীন ও টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়টি উপলব্ধি করা।” উপরোক্ত উক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব এবং সম্ভবত কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টই এর পূর্বে এত স্পষ্ট করে সত্যের পক্ষে কথা বলেননি। ওবামার কাছে ফিলিস্তিনের চাওয়া পাওয়া হলো মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় যে জড়তার সৃষ্টি হয়েছে তার অবসান করানো। রামাল্লায় ফিলিস্তিনের স্বতন্ত্র আইন প্রণেতা মুস্তফা বারগোতি বলেন, “আমরা এখন জরুরি অবস্থার মধ্যে আছি। আমাদের আর খুব বেশি সময় নেই। ইসরাইলকে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ শিগগিরই বন্ধ করতে হবে অথবা দুই রাষ্ট্র গঠন করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানের চিন্তা বাদ দিতে হবে।” তিনদিনের সফরের প্রথমদিন তেলআবিবে পৌঁছান ওবামা। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যকার বিরোধ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং সিরিয়ার চলমান গৃহযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন। তবে মার্কিন প্রশাসন থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিলো যে, নতুন কোন শান্তি প্রস্তাব তিনি দিবেন না। মূলত দুই পক্ষের নেতাদের কথা শুনতেই তিনি মধ্যপ্রাচ্য গেছেন। মূলত তাই করেছেন অর্থাত্ নতুন কোন শান্তি প্রস্তাব তিনি দেননি। বরং দুই পক্ষকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সেই পুরানো কথাগুলো। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে একবার ইসরাইল সফর করলেও নির্বাচিত হওয়ার পর ওবামা আর ওদিকে যাননি। এ জন্য যথেষ্ট সমালোচনাও তাকে পোহাতে হয়েছে। সম্ভবত এ সফরের এটিও একটি কারণ ছিল। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার শীতল সম্পর্কের কথা একটি সত্য ঘটনা। সাধারণ ইসরাইলিদের মধ্যেও ওবামার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে ইসরাইলি জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতেই এই সফরে যাচ্ছেন তিনি। বিল কিনটন চারবার ইসরাইল সফর করে প্রমাণ করেছেন তিনিই প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি যিনি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বার ইসরাইল সফর করেছেন, তবে শান্তির জন্য সত্যের পক্ষে কোন জোরালো কথা বলেননি। সবসময়ই ইসরাইলের পক্ষে কথা বলতেন। ওবামা অবশ্য একথাও বলেন যে, সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে ইসরাইলকে পাশে পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র গর্ববোধ করে। পবিত্র এই ভূমিতে শান্তি ফিরে আসবেই। একথাগুলো ওবামার ভারসাম্য রক্ষা করার মতো কথা বলা হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। ওবামা রামাল্লায় মাহমুদ আব্বাসসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। আব্বাস ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে মুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা প্রায় ৭০ কোটি ডলার সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে ওবামার মধ্যস্থতা চেয়েছেন। আব্বাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিমর হামাদ ওবামার সঙ্গে আড়াই ঘন্টা বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এ সময় আব্বাস ওবামাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ না হলে ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয়। নেতানিয়াহুর সঙ্গে ওবামা বলেন, “অবশ্যই শক্তিশালী ও নিরাপদ একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করা হবে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও সাবভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।” জেরুজালেমের ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রায় একহাজার শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রথম নিজকে ইসরাইলের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে তুলে ধরেন। এরপর তিনি ইসরাইলিদের এটা স্বীকার করতে বলেন যে, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। অথচ ইসরাইলিদেরও যে আশা ফিলিস্তিনিদেরও তাই। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায়বিচারকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি বলেন, তাদের জুতার ভেতর আপনাদের পা রাখেন, তদের দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখেন। ভারসাম্য রক্ষার জন্য হলেও ফিলিস্তিনিদের দু:খকষ্ট বুঝার জন্য ইসরাইলিদের আহ্বান জানান ফিলিস্তিনিদের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখার । একজন নেতা হিসেবে চমত্কার কথা বলেছেন তিনি। ইসরাইলি সেনাদের অত্যাধুনিক গোলা-বারুদের সামনে ফিলিস্তিনি যুবকদের পাথর ছোঁড়াকে পশ্চিমা বিশ্ব জঙ্গীবাদ বা শান্তির প্রতি হুমকি বলে যে বুলি আওড়ায় তার উত্তর ওবামার এই উক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। ইসরাইলি জঙ্গী বিমানে বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ী যখন ইসরাইল জোরপূর্বক দখল ও নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেয় তখন ফিলিস্তিনি মিলিশিয়ারা ঘাড়ে নিয়ে দুই-চারটি রকেট নিক্ষেপ করলে ইসরাইলের দিকে গোটা মার্কিন ও তার অনুগত দেশগুলো সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দেয়। তারা কেন এটি করে তার আসল খবর কেউ রাখতে চায় না বা বুঝতে চায় না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি জানান তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার দিতে চান। কয়েক মাস ধরে মার্কিন কংগ্রেস ওই সহায়তার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেছেন, “ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের স্বার্থে নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এটি জরুরি। আশা করি ওবামার সাথে ফিলিস্তিনিদের এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।” আলোচনা হয়েছেও এবং পররর্তী সময়ে জন কেরি বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ছয় দশক ধরে পুরো বিষয় নিয়ে টান-হেঁচড়া চলছে। উভয় পক্ষের এমন কিছু গভীর স্বার্থ আছে যেগুলো রক্ষা করে কাজ করাও কঠিন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। নেতানিয়াহু বলেন, “আমরা শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রতি অংগীকারবদ্ধ। ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি আমরা শান্তি ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। ওবামার এ সফর ফিলিস্তিনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করবে।” তাবত বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ তাই আশা করে। ওবামার সফর যেন ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তির বাতাস বইতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ‘ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে’- এই কথা বলে যেন অশান্তির দাবানল আর জ্বালিয়ে রাখা না হয় মধ্যপ্রাচ্যে। লেখক :আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইমেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন