আজ ২৮শে মার্চ, আমাদের প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক এম আসাদুজ্জামান স্যারের পরলোক গমনের দিন। এ ধরণী থেকে প্রস্থানের দিন। পাঁচটি বছর মনে হচ্ছে যেন পাঁচটি মাসের মতো। স্যারের প্রস্থান মানে বিস্মৃত হওয়া নয়। স্যারের প্রস্থান মানে হারিয়ে যাওয়া নয়। এ প্রস্থান পরাজয়ের নয়। এ প্রস্থান রাজসিক প্রত্যাবর্তন, এ প্রস্থান আরো কাছে আসার। আসাদুজ্জামান স্যার স্মৃিত হবার ব্যক্তিত্ব নন। তিনি আমাদের মাঝে আছেন সবসময়। সবার অগোচরে তিনি আমাদের বিবেকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। স্যার অভিমান করে বেড়াতে গেলেন রাব্বুল আলামিনের কাছে, তার সৃষ্টিকর্তার সমীপে, আর ফিরে এলেন না।
আসাদুজ্জামান স্যারকে নিয়ে লিখতে যাওয়া সহজ বিষয় নয়। স্যারের জীবন মহাকাব্যের মতো। মনের দরজা-জানালা ভেঙ্গে অসংখ্য আনন্দ-বেদনার স্মৃতি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এত বিশাল মানুষকে ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ করার অসহায়ত্বে পেয়ে বসে। কোন্টা রেখে কোন্টা বলি। আসাদুজ্জামান স্যার শিখিয়েছেন ভালবাসার অনেক রঙ, ভালবাসা রঙধনুর মতো। ভালবাসা শুধু দু’জন নর-নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার বিষয় নয়। ভালবাসা বিলাতে হয়, ভালবাসা ছড়াতে হয় অনেকের মাঝে। ভালবাসা মুক্তহস্তে দান করতে হয়, প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে। অপরের জন্য কিছু করার মাঝে প্রকৃত ভালবাসা খুঁজেছেন স্যার। পেয়েছেনও তিনি। স্যার দিনে দিনে বড় হয়েছেন, কিন্তু এত বড় হননি যে তাকে ধরা-ছোঁয়া যাবে না। তিনি আকাশের তারকা হয়ে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। বরং তিনি মর্ত্যের আলো হয়ে রয়ে গেছেন মানুষের কল্যাণের কথা বলে। তাকে ছোঁয়া যেত, আনন্দ-বেদনার গল্প ভাগ করা যেত, তার কাছে যেয়ে হাসা যেত, তার তাছে যেয়ে কাঁদা যেত। তিনি আমাদের প্রাত্যহিক আসাদুজ্জামান স্যার, যিনি আমাদের সমস্ত বেদনা শুষে নিয়ে নীল হতেন, আর বিনিময় দিতেন আনন্দের লাল রঙ। মানুষের মাঝে আনন্দ সংক্রামিত করার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে হাজারো মানুষের মনের কোঠায় চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন স্যার। স্যার অন্যের ক্ষমতায়নের মাঝে নিজের ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। ক্ষমতায়নের সমস্ত সূত্র-তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে স্যার যত ক্ষমতাবান হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি বিনয়ী হয়েছেন। ক্ষমতা তাকে দাম্ভিক করেনি, ক্ষমতা তাকে আরো পরোপকারী হওয়ার কারণ হয়েছে। ক্ষমতা তাকে স্বার্থপর করেনি। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-পরিজনকে ভালবেসেছেন গভীরভাবে। নিজের শিকড়ের কথা ভোলেননি। মনে রেখেছেন শিবপুরের মানুষের কথা। তারপর শিবপুর ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছেন সমস্ত বাংলাদেশের। তিনি শিখিয়েছেন পরিবার-সমাজের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মহান চরিত্রের অধিকারী আসাদ স্যার সকলের জন্য চরিত্রবান মানুষের মডেল।
আসাদুজ্জামান স্যারকে আমরা বিস্মৃত হতে দেব না। আসাদুজ্জামান স্যার নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান ছিলেন। স্যারের আদর্শ ও কর্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আসাদুজ্জামান ফাউন্ডেশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ ছিল স্যারের কর্মস্থল। ভীষণ ভালবাসতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিফলিত করতে বেশি পছন্দ করতেন। জীবদ্দশায় প্রশাসনিক অনেকগুলো পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত নিবেদন দয়া করে ‘সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনটির নাম ‘আসাদুজ্জামান সামাজিক বিজ্ঞান ভবন’ নামকরণ করুন। বিশ্ববিদ্যালয় যদি রাজনৈতিক সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে না পারে, আর কে পারবে ? আজ যদি বর্তমান প্রশাসন ভিন্নমতের একজন যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান করে তবে ভবিষ্যতে তাদেরকেও বিরোধী পক্ষ সম্মান করবে। আসাদুজ্জামান জীবন উত্সর্গ করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য-আমাদের উচিত তার আদর্শ, কর্ম, চিন্তা ও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এবং তা এখনই।
লেখক : উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
