অনেকদিনের ইচ্ছে লিখব, কিন্তু লেখাটা শুরুর আগে হাত-পা শুধু নয়, পুরো শরীর যেন কাঁপছে। কখনো অসাড় হয়ে আসছে আঙুলগুলো। কারণ যাকে নিয়ে এই লেখাটি লিখছি তিনি খন্দকার আবু তালেব। আর তাকে নিয়ে কিছু লিখলে খুব স্বাভাবিকভাবে আরো দুজনের নাম চলে আসে, একজন সিরাজুদ্দীন হোসেন এবং আরেকজন মোহাম্মদ তোহা খান। দেশের সাংবাদিকতার অঙ্গনে এই তিনজনের একজনের নাম উল্লেখ না করলে কিছুই লেখা সম্ভব তো হবেই না, বরং অন্যায় হবে। সেই ছেলেবেলা থেকে এই ত্রয়ীর সম্পর্কে এত কিছু শুনেছি সেটা না জানালে হয়ত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বঞ্চিত করা হবে। এজন্য সুযোগ খুঁজছিলাম বহুদিন ধরে। মনে মনে ঠিক করলাম ২৯ মার্চ খন্দকার আবু তালেব সাহেবের মৃত্যুদিনে কিছু লিখবো।
খন্দকার আবু তালেব ও সিরাজুদ্দীন হোসেন-এই দুজনকে আমার দেখার সুযোগ হয়নি। কারণ দুজনেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তার চামেলীবাগের বাসা থেকে নিয়ে হত্যা করে রাজাকার আলবদররা। তবে খন্দকার আবু তালেবকে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পর পরই মিরপুরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে কাদের মোল্লার দল। এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি খন্দকার আবু তালেব হত্যা মামলার রায়ের পরই উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। সে যাই হোক, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দুই পরম সহকর্মী-বন্ধুর স্মৃতি ধরে রেখেছিলেন আমার বাবা মোহাম্মদ তোহা খান। বাবার কাছ থেকেই খন্দকার আবু তালেব ও সিরাজুদ্দীনের কথা এতই জানতে পেরেছি যে, প্রতিক্ষণেই মনে হয় তারা তিনজন বুঝি আমার সঙ্গেই আছেন। তাই কল্পনা করি, কেমন দৃশ্য হতো যখন তারা তিনজন একসঙ্গে হতেন, সেটা কর্মস্থলে হোক কিংবা পরিবারের সঙ্গে। কারণ তারা তিনজনই একে অন্যের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিলেন। আমার বাবার কণ্ঠস্বর তো মনে আছে। কিন্তু ভাবনার জগতে ডুব দিয়ে শোনার চেষ্টা করি কেমন ছিল আবু তালেব আর সিরাজুদ্দীন হোসেনের কণ্ঠস্বর। শুনেছি শহীদ আবু তালেবের মুখ থেকে হাসি বের হলে, সেই শব্দ দূর থেকে শোনা যেত। আব্বুর কাছ থেকেই জেনেছি কখন থেকে তিনি তার দুই বন্ধু সিরাজুদ্দীন হোসেন ও আবু তালেবকে হারিয়েছেন।
আমাদের এবং খন্দকার আবু তালেবের পৈত্রিক বাড়ি সাতক্ষীরা হওয়ার জন্য পারিবারিক ওঠাবসাও ছিল প্রচণ্ড রকমের। শুধু তাই নয়, তারা দুজন এক সঙ্গে সাতক্ষীরার প্রাণনাথ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। কলকাতা গিয়ে ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। দুজনই চিকিত্সা শাস্ত্রের মাঝপথে ইতি টেনে বেছে নেন পোস্ট অফিসের চাকরি। আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতায় চলে আসেন। এভাবে সময় গড়াতে গড়াতে এই ত্রয়ীর বন্ধন অটুট ছিল। সিরাজ চাচার ঢাকার চামেলীবাগের বাসার অনেক গল্প আমার মায়ের কাছ থেকে শুনিছি। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, আবু তালেব ও মোহাম্মদ তোহা খান দুজনই সরকারি বরাদ্দ করা প্লট পেয়েছিলেন ঢাকার মিরপুরে। তাও আবার বাসার ঠিকানার পার্থক্য ছিল মাত্র ১। আমাদের বাসার নম্বর ১২। আর আবু তালেব সাহেবের বাসার নম্বর ১৩। একাত্তরে দুজনের গাড়িও একসঙ্গে পুড়িয়ে দেয়া হয় গায়ে কেবল ইত্তেফাক লেখার কারণে। ১৯৭৩ সালে দৈনিক বাংলায় আব্বুর লেখা থেকে জেনেছি, তাদের তিনজনেরই মৃত্যুর ইচ্ছে ছিল একসঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরও অনেক প্রথিতযশা দেশত্যাগ করলেও আব্বু ও সিরাজ চাচা ঢাকাতেই ছিলেন। কিন্তু একাত্তরে এই খন্দকার আবু তালেব ও সিরাজুদ্দীন হোসেনের মৃত্যু এই ত্রয়ীর বিচ্ছেদ ঘটায় তবে আত্মার বিচ্ছেদ এখনো অটুট। আব্বুকে দেখেছি, তার দুই বন্ধুর ছবি সযতনে আগলে রাখতেন অ্যালবামে। হাত বুলাতেন তাদের ছবিতে। সিরাজ চাচা সম্পর্কে আব্বু লিখেছিলেন, “সিরাজকে মরহুম বলতে পারি না।”
আব্বু আমাদের বলে রেখেছিলেন আমার মৃত্যুর পর কবর যেন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার বিশ্বাস ছিল, তার দুই বন্ধু হয়ত এখানেই আছেন। তাই বোধ হয় আমাদের তিন পরিবারের সম্পর্কের বন্ধন রইবে আজীবন।
লেখক :সাংবাদিক
