মহান স্বাধীনতা দিবস পালিত হলো। জাতীয় দিবসে জাতীয় জীবনের গুরুত্বই আলাদা। আর দিবসটি যদি হয় আনন্দের এবং পাশাপাশি সংবেদনশীল তাহলে তো অনেক ভাববার বিষয় আপনা-আপনিই ভেতরে এসে জমা হয়। বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাড়াও দৈনিকগুলো স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। প্রবন্ধ-নিবন্ধ-গল্প-কবিতা ছাড়াও বিশিষ্ট কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধকালীন স্মৃতিগুলো হূদয়ে দাগ কাটে। সবগুলো লেখাতেই দেশাত্মবোধ বিধৃত হয়েছে, স্বাধীনতার স্বপ্নকেই লালন করা হয়েছে। লেখকগণ সবাই একই দলের নন, তবুও লেখার পার্থক্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাতে মনে হয়েছে তারা সকলেই এই দেশটাকে ভালোবাসেন, দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কারা সংখ্যালঘিষ্ঠ সে বিবেচনা করে কেউ কথা বলেননি। এই পজিটিভ দিকটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবলে বলতে পারি বর্তমান সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে কেন সংলাপ হবে না?
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক লিখেছেন, ‘পতনশীল বস্তু যেমন ক্রমাগত নিচের দিকে নামতে থাকে, পতন রোধ করার ব্যবস্থা করতে না পারলে যেমন তা একেবারে তলানিতে ঠেকে, ঠিক তেমনটাই আমার কাছে মনে হয়।’ দুটি জোটের কার্যকলাপ দেখে উক্ত কথাটির সাথে দ্বিমত পোষণ করবার কোন সংগত কারণ খুঁজে পাই না। কখনো কখনো মনে হয় বিএনপি তার আদর্শ থেকে সরে গেছে ও যাচ্ছে। আবার মনে হয় আওয়ামী লীগও কী তার আদর্শের জায়গা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে? এই দুটি দলের আদর্শের কথাটি ঘুরে-ফিরে আসে এজন্য যে, জাতির কাছে তাদের দায়বদ্ধতা অনেক। তারা যদি জাতিকে জিম্মি করে ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বপ্ন দেখে তাহলে জাতি যে সূক্ষ্ম বিচারটি করে থাকে যা ইতিপূর্বে বারবার দেখিয়েছে। এই দুটি দলকে বুঝতে হবে তারা কার সাথে জোট করছেন, কার সাথে মহাজোট করছেন। যে সকল দল স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে যায় না বা যেতে পারে না, যে সকল দল ধর্মের দোহাই দিয়ে লুটতরাজ, ধ্বংসযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগে উন্মত্ত থাকে, যে সকল দল সার্বভৌম রাষ্ট্রকে অস্বীকার করে জাতীয় পতাকার অবমাননা করে সে সকল দলকে রাষ্ট্রে বিশ্বাসী, ধর্মে বিশ্বাসী, স্বাধীনতায় বিশ্বাসী কোনো দল জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে কী করে? প্রধান দুটি দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব কোথায় সেটা বুঝতে কারো বাকি নেই। বিএনপির নেতৃস্থানীয় কাউকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ইতিহাস টানতে শুরু করেন, জামায়াতকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ হ্যান করেছিল, ত্যান করেছিল ..... ইত্যাদি। তদ্রূপ আওয়ামী লীগের কাউকে প্রশ্ন করলেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, ঐ সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে ... ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা এই ইতিহাসের গেঁড়াকল থেকে কবে মুক্তি পাব? আগামী দিনগুলোতে আমরা কীভাবে কী করতে পারব, কীভাবে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারব তা নিয়ে কোন চিন্তা-ভাবনার কথা শুনি না কেন? নতুন প্রজন্ম কোন ভিত্তির উপর দাঁড়াবে, তারা কীভাবে চলমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হবে তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন? এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা কী শুধু পতনের দিকেই নিমজ্জিত হব?
যে ইস্যুটি নিয়ে ১৮ দলীয় জোট হরতাল দিচ্ছে, সম্পদ ও মানুষের ক্ষয়ক্ষতি করছে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আওয়ামী লীগও এমনটি করেছিল। আমরা কি তাহলে বারবার ঐ দুটি দল/জোটের কাছে পিষ্ট হতে থাকব? ঝড়ে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বৃক্ষও আবার সতেজ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা এই বাঙালি জাতি কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। বঙ্গবন্ধু গর্ব করে বলেছিলেন, আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। হ্যাঁ, ঐ একটিবারই— স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্তই। কিন্তু তারপর? যে যেভাবে পারে দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে উল্টোসিধে কথা বলে চলছেন, ক্ষতি করে চলছেন। অনেক দেখলাম, অনেক শুনলাম। এখন আর বিশ্বাস করতে পারছি না রাজনীতিবিদদের। মাননীয় আদালতও হয়তো সে কারণে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে অথবামূলক রায় দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও দুটি টার্ম থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও এখনই এটা সংসদে বাতিল না করলেও চলত। এ প্রসঙ্গে সাংসদ গোলাম মওলা রনি বলেছেন, আদালত রাজনীতিবিদ সম্পর্কে এমনই মন্তব্য করেছেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে। ফলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থেকেও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। বাহ্বা পাবার কথা, খুবই ভালো কথা, প্রশংসার যোগ্য কথা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, রাজনীতি কী শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাই করেন? আর কেউ করেন না? আর সকলের আত্মসম্মানবোধ নেই? ঘটনাটা যদি শুধু প্রধানমন্ত্রীর আত্মসম্মানেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে বলার কিছু নেই। আর যদি সকল রাজনীতিবিদের ব্যাপার হয় তাহলে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছিল সংসদে বিল উত্থাপনের আগেই মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও অন্য নেতৃবৃন্দকে আহ্বান করে আলোচনায় বসা। স্পর্শকাতর বিষয়ে সকলের আত্মসম্মানে আঘাতের ফলে আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার হতো না বলেই বিশ্বাস। মূল কথা হলো, ব্যক্তিস্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থ ছাড়া যে রাজনীতিবিদরা কাজ করেন না এটা তার একটি প্রমাণ। আদালতের কথা এত পছন্দই যদি হয় তাহলে সংলাপে বসার জন্য হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছেন, তা মেনে নিয়ে বসে পড়ুন। জনস্বার্থে সংলাপের বিকল্প নেই। সংলাপে বসার জন্য সরকারি দলকেই ভূমিকা নেয়া ঠিক হবে বলে মনে করি। বঙ্গবন্ধুও তত্কালীন সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের সাথে গোলটেবিল বৈঠকে বসেছিলেন। দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে কাজ করতে যারা নমনীয় হবে তাদের প্রাপ্তিটাই অধিক হবে বলে মনে করি।
দুই নেত্রীকে সংলাপে বসার জন্য জাতি উন্মুখ হয়ে বসে আছে। ইগো থেকে বের হয়ে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখার সুযোগ দুইজনের জন্যই কল্যাণকর হবে, জাতি উপকৃত হবে। জনগণের কথা কেউ ভাবছেন কিনা জানি না। পত্রিকা খুললেই দেখতে পাই ধ্বংসের মুখে অর্থনীতি, পোশাক শিল্প হুমকির সম্মুখীন, ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শেয়ারবাজারে দরপতন ইত্যাদি। এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে দেখার কোন নমুনা দেখতে পাচ্ছি না। একে অপরের সমালোচনায় বিভোর। মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ‘সেনাবাহিনী বসে থাকবে না’ বলায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। মন্ত্রী পর্যায়ের লোক ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতারা বিষয়টি নিয়ে বিষয়ান্তর করে ফেলেছেন। কিন্তু তিনি কী বলতে চেয়েছেন, কেন বলতে চেয়েছেন, হঠাত্ করে সেনাবাহিনী উস্কে দেবার কারণটাইবা কী এটা নিয়ে কাউকে গভীরে পর্যালোচনায় যেতে দেখিনি। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি টর্নেডোতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে ঠিকমতো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায় না। যদিও কিছু পৌঁছায়, স্থানীয় প্রশাসন আংশিক বিতরণ করে বাকিটা ভাগাভাগি করে নেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে বক্তৃতা করে এসেছেন তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন বলে। পাশে থাকার চেয়েও জরুরি হলো ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া। তবেই জনগণের পাশে থাকা হবে। আর জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সংলাপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবন করতে হবে। শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হকের সাথে একমত পোষণ করেই বলতে চাই, রাষ্ট্র হোক জনগণের।
লেখক :শিশুসাহিত্যিক
