বাংলাদেশ চাউল রফতানি করিবে, এমনটাই জানা যায় কয়েক মাস আগে। এখন আবার খবর হইয়াছে যে, চাউল আমদানি করিতে হইবে। ইহাই যদি হয় নিছক খাঁটি কথা, তাহা হইলে আগের খবরটির কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। অর্থাত্ চাউল রফতানির তথ্য আসলে সঠিক নয়। সেই সঙ্গে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টিও নিছক কথার কথা ছাড়া আর কি? যদিও খাদ্যমন্ত্রী সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলিয়াছেন যে, তাহারা পর্যালোচনা করিয়া দেখিয়াছেন, রফতানি করা ঠিক হইবে না। আর সেই কারণেই এখন তাহারা আমদানিকে গুরুত্ব দিয়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে থাকা চুক্তিগুলি নবায়নের উদ্যোগ লইয়াছেন। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাইতেই হইবে। কেননা, রফতানি করিবার যে ভুল সিদ্ধান্ত তাহারা লইয়াছিলেন, তাহা পুনর্বিবেচনা না করিলে বরং দ্বিতীয় ভুলটি হইত। পর্যাপ্ত মজুদ গড়িয়া তোলা যাইত না। চাউলের সংকট দেখা দিত। সেই কারণে আগের সিদ্ধান্ত ঠিক হয় নাই এমনটি মানিয়া লইয়া সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত হইয়াছে। আর সেই কাজটিই করিয়াছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সম্ভাব্য সংকটের আশংকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে চাউল আমদানি করিবার জন্য থাইল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হইতেছে। আগের করা চুক্তির মেয়াদ বাড়াইয়া সর্বোচ্চ দশ লাখ টন আমদানি করা যাইবে এমন শর্ত জুড়িয়া দেওয়া হইতেছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের মধ্যে ঐ পরিমাণ চাউল বাজারমূল্যে কিনিতে পারিবে বাংলাদেশ সরকার।
সরকারের এই উদ্যোগ সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করিবার জন্যই। একই সাথে ইহাও স্পষ্ট হইয়াছে যে, চাউল রফতানি করিবার মত সামর্থ্য আমরা আজও অর্জন করিতে পারি নাই। আরো খুলিয়া বলিলে বলিতে হয়, চাউল উত্পাদনে আমরা এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হইতে পারি নাই। স্বাধীনতার ৪২ বত্সর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। বাড়িয়াছে জনসংখ্যা। বাড়িয়াছে খাদ্যের উত্পাদনও। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়িবার হারে খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হয় নাই। আধুনিক চাষবাস যান্ত্রিকীকরণ হইলেও তাহার প্রয়োগ সামান্যই। আমাদের দেশে কৃষির মাত্র ২০ ভাগ যান্ত্রিকীকরণ হইয়াছে। আর কমিয়াছে চাষের জমির পরিমাণ। বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন, পৃথিবীর কৃষি উন্নত দেশগুলি যেই প্রক্রিয়ায় তাহাদের খাদ্য উত্পাদন বাড়াইবার স্বার্থে কৃষির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, কলাকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাইয়াছে, উহা হইতে আমরা এখনো অনেকটাই পিছাইয়া রহিয়াছি। সময়মতো কৃষককে উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, সার, সেচ ও কীটনাশক প্রদানসহ নানা সুবিধা প্রদান ও কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও এখনো প্রায় উপেক্ষিত। উপরন্তু, দেশে প্রতিদিনই কৃষিজমি নষ্ট করিয়া নির্মিত হইতেছে নূতন নূতন ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মার্কেট, স্কুল-কলেজ, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা ইত্যাদি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও কৃষিজমি তাহার উত্পাদন ক্ষমতা হারাইতেছে। এইসব চলিত বিষয় থাকিবেই। প্রশ্ন হইতেছে, এইগুলি বিবেচনা করিয়াই সরকারকে নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিতে হইবে। কিন্তু সেই দিকে খুব বেশি নজর আছে বলিয়া মনে হয় না। ২০১৩ সালে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিকল্পনা (বিসিআইপি) প্রণয়ন করিলেও তাহার বাস্তবায়ন নিয়া যথেষ্ট সংশয় রহিয়াছে। এই সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন বিশেষজ্ঞরাও। যাহার কারণেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকিয়া যাইতেছে।
পিছন ফিরিলে দেখা যাইবে, ১৯৭১ সালে চাউলের উত্পাদন ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ টন। বর্তমানে উহা দাঁড়াইয়াছে প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ টনে। গত ২০০৯-১০ অর্থবত্সরে দেশে চাউল উত্পাদিত হইয়াছে ৩ কোটি ৩৪ লাখ টন। ২০১০-১১ অর্থবত্সরে ইহার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার টন। সেইখানে চলতি অর্থবত্সরে চাউল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টন। এই চিত্র ইহাই প্রমাণ করে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্যশস্য উত্পাদনের হার কম। তাহা হইলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হইবে কিভাবে? বরঞ্চ, মানুষের খাদ্যগ্রহণ ৯৪৭ গ্রাম হইতে বাড়িয়া ৯৯৯ গ্রামে দাঁড়াইয়াছে। কমিয়াছে আবাদী জমির পরিমাণও। ইহা নিয়া তথ্যের বিভ্রাটও রহিয়াছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে আবাদী জমি ৮২ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর এবং প্রকৃত আবাদযোগ্য জমি ৮০ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রহিয়াছে ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে দেশে আবাদযোগ্য জমি ছিল ৮১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর। ২০০৩ সালে ছিল ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর। ২০০৭ সালে তাহা কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ৬৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টরে। এই হিসাবে প্রতি বত্সর গড়ে কমিয়াছে ৮০ হাজার হেক্টর জমি। এই অবস্থায় দেশের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। না করিলে আগামী দশকে কৃষি ও জলাভূমির সংকটে খাদ্য আমদানি নির্ভরতা আরো বাড়িবে। যাহা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও ঝুঁকির মুখে ফেলিবে।
