‘কেন’-এর উত্তরও খুঁজিতে হইবে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৫
হরতালে গাড়ি ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, প্রতিপক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গোলাগুলি, পুলিশের ধরপাকড়, নির্মম মৃত্যু কোন নূতন ঘটনা নহে। বাংলাদেশের মানুষ বারবার এমন অস্বস্তি ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়িতেছেন। রাজনৈতিক উত্তাপে অনেক ঘটন-অঘটনেরই জন্ম হইতেছে। তৈরি হইতেছে অনেক মর্মস্পর্শী কাহিনীও। কিন্তু নূতন কোন ঘটনা বা কাহিনী আগেরগুলিকে ম্লান করিয়া দিতেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা দেশব্যাপী ৩৬ ঘন্টার হরতাল শেষ হইল গত বৃহস্পতিবার। শেষের দিনে চট্টগ্রামে নবম শ্রেণীর একজন ছাত্রী মায়ের হাত ধরিয়া কোচিং সেন্টারে যাইতেছিল। এমন সময় রাস্তায় ককটেল বিস্ফোরিত হইলে তাহার ডান চোখে আঘাত লাগে। ডাক্তাররা তাহার চোখের অপারেশন করিয়াছেন। স্প্লিন্টারের আঘাতের কারণে তাহার চোখের ভ্রূতে সেলাই দিতে হইয়াছে। অন্যদিকে একই দিন লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হরতাল সমর্থকরা হামলা চালায় বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। এই ঘটনায় আহত ও ভীতসন্ত্রস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে অবস্থান নেয়। এইভাবে হরতালের নির্মম শিকার অনেকেই হইতেছেন যাহা দুঃখজনক। অতীতে যেমন ঘটিয়াছে, তেমনি বর্তমানেও অব্যাহত আছে। নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার ধরন দিন দিন পরিবর্তিত হইতেছে মাত্র। কিন্তু কেন এমনটি ঘটিতেছে বারংবার, তাহার সদুত্তর পাওয়া কঠিন। এখন আমাদের এই ‘কেন’-এর উত্তরই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। আসলে ইহা মুদ্রার একটি দিক। মুদ্রার অপর দিকটির দিকেও আমাদের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামি ধরিতে গেলে সংঘবদ্ধ গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ইহাতে গত শুক্রবার পাঁচজন নিহত হইয়াছে। আহত হইয়াছে অর্ধশতাধিক। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি বিধায় এই দিন হরতাল আহ্বানের প্রশ্নই উঠে না। তাহা হইলে কেন তাহাদের প্রাণ দিতে হইল ইহারও জবাব থাকা দরকার। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে কেন মামলা-মোকদ্দমা দেওয়া হইতেছে তাহাও একটি বড় প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের প্রতিবাদই করিতে দেওয়া হইতেছে না। রাজনৈতিক কার্যালয় অবরুদ্ধ করিয়া রাখা হইতেছে। সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হইলে মানুষের অসহায়ত্বের কোন সীমা থাকে না। প্রতিবার নির্বাচন ঘনাইয়া আসিলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ কেন বাধাগ্রস্ত হয় তাহা সবচাইতে দামি প্রশ্ন। ইহাতে জনগণের রায়ের প্রতি আমাদের অনেকের আস্থাহীনতাই প্রমাণিত হইতেছে। ফলে আমরা জাতীয় ও নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে যতটা না তত্পর, তাহার চাইতে অন্যের এজেন্ডা লইয়াই আমাদের মাথাব্যথা বেশি। একজন প্রকৃত নেতার কাজ হইল, শত সমস্যা থাকিবে, তবে সেই সমস্যা দেখিয়া পথ ও মনোবল হারাইলে চলিবে না। সংকটের সমাধান করিতে হইবে। কিন্তু আমাদের কথাবার্তা ও কাজেকর্মে অন্তহীন সমস্যাই তৈরি হইতেছে। সমাজে ভাঙ্গন ও বিভক্তির রেখাগুলিকে বড় করিয়া তোলা হইতেছে। ইহা করিয়া যাহারা বাঁচিয়া যাইবেন বলিয়া ধারণা করিতেছেন, তাহারা আসলে বিভ্রান্তি ও ঘোরের মধ্যে আছেন। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, ইরাক, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, মিসর, ইরান প্রভৃতি দেশেও অস্থিরতা লাগিয়া আছে। অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে টালমাটাল অবস্থা ইউরোপেরও। ইদানিংকালে পৃথিবী জুড়িয়া কেন এই অস্থিতিশীলতা এই প্রশ্নও আমাদের তাড়া করে। আসুন, আমরা এতসব ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজিয়া বাহির করি। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেঈমানি করিলে এবং যাহা নিজের জন্য ভাল তাহা অন্যের জন্য ভাল মনে না করিলে হাজারটা ‘কেন’ প্রশ্নের জন্ম নেওয়াই স্বাভাবিক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন