বেশ কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশের বহু জায়গায় সন্ত্রাসীরা হিন্দুদের উপর হামলা পরিচালনা করে। এসব জায়গায় হিন্দুদের বাড়ি-ঘর এবং মন্দিরে আগুন দেয়া হয়, ভাংচুর করা হয়। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক সংখ্যালঘুরা আজ নিঃস্ব হয়ে দিন কাটাচ্ছে। থেমে থেমে এখনও হামলা চলছে কোথাও না কোথাও। সারা দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছে। যেসব স্থানে এখনও হামলা ঘটেনি, সেইসব স্থানের হিন্দুরাও ভয়ে আছে কখন তাদের উপাসনার মন্দিরটিতে আগুন দেয়া হয়, কখন তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এমন তো তারা কেউ কখনও আশা করেনি। এদেশের স্বাধীনতার জন্য তারাও সমানভাবে যুদ্ধ করেছিল; প্রাণ দিয়েছিল, ঘর-বাড়ি সবই বিসর্জন দিয়েছিল। আজ ৪২ বছর পরও কি তারা শুধু দিয়েই যাবে? স্থানীয় একটি প্রভাবশালী দৈনিক প্রকাশ করেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ মার্চ এই ২৪ দিনে বাংলাদেশের ৩২টি জেলায় মোট ৩১৯টি মন্দির, বাড়ি, দোকান ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর মধ্যে দোকান ১৫২টি, বাড়ি ৯৬টি এবং মন্দির ৭১টি। সন্ত্রাসীরা তাদের বিক্ষোভের শত্রু হিসাবে সংখ্যালঘুদের বেছে নিচ্ছে কেন?
সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দোকানেও হামলা করেছে। পুলিশ ও সরকার তাদের প্রতিপক্ষ সেটুকু বুঝি। তারা গাড়ি ও দোকান ভাংচুর করে যেন সকলে তাদের শক্তির আন্দাজ করতে পারে এবং দেশে বিশৃংখলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এটা বুঝাতে পারে। কিন্তু এর সাথে হিন্দুদের উপর আক্রমণ কেন? ১৯৪৭-এর পর থেকে এদেশ থেকে হিন্দুরা শুধু বিতাড়িত হয়েছে। একের পর এক অত্যাচার হয়েছে আর কিছু হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছে। হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করার পর তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে আবার শুরু হয়েছে নতুন বিশৃংখলা। কখনও শত্রু সম্পত্তি, কখনও অর্পিত সম্পত্তির ব্যানারে সরকারের এবং এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহলের মধ্যে চলেছে ভোগ-দখলের নানাবিধ অবৈধ প্রতিযোগিতা। হিন্দুদের বিতাড়িত করতে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে তারা আবার হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করার বা অল্পমূল্যে লাভ করার এক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। এমনই ধারা শুধু ১৯৪৭-এর পরপরই নয়; একই ধরনের সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব দেখেছি ১৯৭১, ১৯৯০, ১৯৯২ এবং ২০০১ সালেও। কোন কিছু হলেই যেন হিন্দুরা আক্রান্ত হবে। এ যেন তাদের কপালের লিখন। যখনই ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে ঠিক তখনই নতুন করে নতুন দলের শুরু হয়েছে হিন্দুদের উপর নির্যাতন। আর নির্যাতনের এক পর্যায়ে কিছু হিন্দুর দেশ ত্যাগ এবং সেই দেশ ত্যাগের হাত ধরে তাদের সম্পত্তি দখলের প্রতিযোগিতা স্বার্থান্বেষী মহলের। এমনি ধারায় এদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমেছে এবং সংখ্যা কমার ফলে বসবাসরত হিন্দুদের মানসিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতা কমেছে। আজ তাই তারা আক্রান্ত হলে অথবা নিগৃহীত হলে তাদের কাছ থেকে প্রতিবাদটুকুও পাওয়া যায় না। এমনকি আক্রান্ত হওয়ার পর আক্রমণকারীদের চিনে ফেললেও ভয়ের কারণে চেনা মানুষের নামটা পর্যন্ত তারা প্রকাশ করে না। এদেশে বসবাস করছে এটাই যেন তাদের অপরাধ। তা-ই যদি না হবে তাহলে শিকার হবে কেন হিন্দুদের ঘর-বাড়ি বা হিন্দুদের মন্দির?
আমরা সবাই দেখছি, কোন রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হতেই আন্দোলনের প্রধান দু’টি টার্গেট হল পুলিশ এবং হিন্দুদের মন্দির ও ঘর-বাড়ি। এ যেন বিড়ালের রাগ বেড়ার উপর। এক শ্রেণীর সন্ত্রাসীদের কিছু একটা হলেই হিন্দুদের উপর আক্রমণ। হিন্দুরা কি বাংলাদেশে ভুল রাজ্যে ভুলভাবে জন্ম নিয়েছিল? সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই তারা মার খেয়ে চলেছে। আজও তা থেমে যায়নি। থেমে থেমে চলছেই মন্দির ভাঙ্গা। মন্দির, মসজিদ, প্যাগোডা এসব নিজ নিজ ভক্তদের উপাসনার পবিত্র স্থান। মসজিদ যেমন মুসলমানদের জন্য একটি আবেগ আর বিশ্বাসের জায়গা, তেমনি মন্দিরও হিন্দুদের নিকট পরম আশ্রয়ের একটি ঠিকানা।
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের। দেশে বিদ্যমান বিশৃংখল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার দায়িত্ব সরকারের। দেশের মানুষের জানমালের সুরক্ষা করার দায়িত্বও সরকারের। হিন্দুরাও মানুষ এবং তাদের জানমালের রক্ষা করার দায়িত্বটুকুও সরকারেরই। সরকার কিভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করবে তা তার উপরই নির্ভর করবে। গত কয়েক মাস ধরে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে বিচারাধীন নেতাদের মুক্তির দাবিতে এবং ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করার দাবিতে দেশে সহিংস তাণ্ডব ঘটিয়ে চলেছে। তারা পুলিশকে হত্যা করেছে, পুলিশকে পিটিয়ে আহত করেছে, জনগণের জানমালের ক্ষতি করেছে, রাস্তায় গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে পথচারীকে হত্যা করেছে, জনসাধারণের দোকান ভাংচুর করেছে, শহীদ মিনার ভাংচুর করেছে, বালাদেশের পতাকাকে পদদলিত করেছে, জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের অভ্যন্তরে আগুন দিয়েছে, মানুষ ও পুলিশের উপর ককটেল মেরেছে, রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, রেলের বগী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে, বিদ্যুত্ কেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছে, সরকারি অফিসে আগুন দিয়েছে ইত্যাদি অনেক সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে সারা দেশে। কিন্তু এই সঙ্গে তারা বিশেষভাবে যে অপরাধটি সংঘটিত করেছে তা হল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘর-বাড়ি ও মন্দির আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রীতিমত রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা গভীর দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি, সরকার এ ব্যাপারে নীরব এখনও। সরকার একদিকে পারছে না সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবতা ফেরাতে। তাই এদেশের মানুষ হিসাবে উদ্বেগ প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ আমাদের আছে। এই সব সন্ত্রাসীরা দেশে কি চাচ্ছে তা সরকারকে বুঝতে হবে। দেশ যদি সুস্থ না থাকে, তবে সেখানে সরকারই কি বা বিরোধী দলই কি। তাই সময় থাকতেই সরকারকে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর সময়মত সঠিক কাজটি না করতে পারলে শুধু সরকারকেই নয় পুরো দেশটাকেই বড় রকম মূল্য দিতে হবে। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় তারা একের পর এক আইন বহির্ভূত সহিংস কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে, একের পর এক মানুষের জানমালের ক্ষতি করছে আর সরকার তার পুলিশকে তাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে মার খাওয়াচ্ছে। এটা কোন শক্ত অবস্থানের সরকারের সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সরকারকে একটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান করা সরকারের বিশেষ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি যে, সরকার হিন্দুদের নিরাপত্তা প্রদানে ততটা উদ্যোগী এবং সমর্থ হচ্ছে না। হিন্দু মন্দিরের উপর আক্রমণ চলেছে এবং চলছে। এটা যেন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার কাজটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলের কাছেও। তাই আমরা আশা করবো, বিরোধী দল বিএনপি এই সব সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবকে নিন্দা ও ঘৃণা জানিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াবে।
হিন্দুরা এদেশে সংখ্যালঘু, তারা দুর্বল। তাদের শক্তি নেই এই সব সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবের উত্তর দেয়ার। কিন্তু সরকার বা দেশ তো তাদের মত দুর্বল নয়। রাষ্ট্র তো দুর্বল নয়। তারা কি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে এমন অত্যাচারের ঘটনা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর? সংখ্যালঘু কোন অপরাধের নাম নয়। সংখ্যালঘুকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করে তার অধিকার প্রদানের বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক এমন কামনাই করছি।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা
