মাননীয় জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারপার্সন শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী গোলাম নবী আজাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী, এসইএআরও’র সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধি, সম্মানিত ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ-শুভ সকাল।
ভারত সরকার ও শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করছি। বিশেষ করে, আমার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্কের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অটিস্টিকদের কল্যাণে যারা কাজ করছে তাদের মধ্যে বাস্তবিক অর্থে আপনারা এগিয়ে আছেন।
২০ বছর আগে যখন আমি মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখাপড়া শুরু করেছিলাম তখন অটিজম বা পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার আক্রান্তের সংখ্যা কম দেখা যেতো। কিন্তু আজকে অটিজম বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি। এটা এতো ব্যাপক মাত্রায় পৌঁছেছে যে, অটিজম আক্রান্তদের প্রয়োজনকে বিবেচনায় আনতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে দুটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রথম প্রস্তাব পাস হয় ২০০৭ সালে, যাতে ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবে অনুসমর্থন আসে ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর, যাতে প্রথমবারের মতো অটিস্টিক ব্যক্তি, তাদের পরিবার ও সম্প্রদায়কে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সেগুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এছাড়া ২০১২ সালে সাউথ ইস্ট এশিয়া রিজিওনাল অফিসের (এসইএআরও)মাধ্যমে অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইয়োগজাকার্তায় এর ৬৭তম আঞ্চলিক পর্ষদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে অটিজমকে আলাদা হিসাবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৮৮ জন শিশুর মধ্যে একজনের অটিজমের লক্ষণ রয়েছে এবং ছেলেদের মধ্যে প্রতি ৫৪ জনে একজনের এ লক্ষণ আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ রয়েছে অর্থাত্ প্রতি ৩৮ জন শিশুর একজনের এ সমস্যা রয়েছে। ২০১২ সালে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অটিজম আক্রান্তদের চিকিত্সা ও জীবনযাপনের জন্য বছরে ১৩৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং অটিজম আক্রান্ত একজন ব্যক্তির সমগ্র জীবনের জন্য এ ব্যয়ের পরিমাণ ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের অঞ্চলে এ সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে জানার জন্য কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। এর ফলে সমাজকে কতোটা মূল্য দিতে হচ্ছে তাও আমাদের জানা নেই। তাই এ সমস্যা আমাদের অঞ্চলেও একই মাত্রায় আছে বলে ধরে নিলে আমরা এটাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করতে পারি। তাছাড়া অটিস্টিকদের জন্য কল্যাণকর কর্মসূচিগুলো আমাদের বর্তমানের সরকার ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত না করা পর্যন্ত এ অঞ্চলের পরিবারগুলো বিশেষত যারা দরিদ্র তাদের পক্ষে এসব সেবা পাওয়ার আশা ও সুযোগ কোনোটাই নেই। আগে এখানে সংক্রামক রোগের ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজের মতো অসংক্রামক ব্যাধিগুলো চিকিত্সার বাইরে থেকে গেছে এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সমাজে অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে- যাতে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয়েছে।
গত শতকে শিশুদের মানসিক বিকাশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভূতপূর্ব অগ্রগতি হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের ও তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণের সেবাগুলো সেভাবে বাড়েনি। তারপর আমাদের এখানে যেসব সেবা দেয়া হয় সেগুলোর বেশিরভাগই হয়ে থাকে নগরভিত্তিক। তাই গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এবং দরিদ্ররা সেগুলো পায় না। কী কারণে অটিজম হয় তা আমাদের জানা নাও থাকতে পারে, কিন্তু অটিস্টিকদের নিজেদের সামর্থ্য অনুধাবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা জানি প্রতি ১১ মিনিটে একজন অটিজম আক্রান্ত সনাক্ত হচ্ছে। প্রতিবছর মোট যতো সংখ্যক শিশু এইডস, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তার চেয়ে বেশি সংখ্যক অটিস্টিক শিশু সনাক্ত হয়। এর সবচেয়ে কার্যকর চিকিত্সা হচ্ছে, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সমস্যার ধরন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ। তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এর প্রভাব কিভাবে কমিয়ে আনা যায় তা বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গত দুই বছর বাংলাদেশে কাজের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, অটিজমের মতো নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের যথাযথ সেবা দেয়ার জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড হতে হবে বহুমুখী, সম্প্রসারিত এবং অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত। সেগুলো শুধু তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিলে চলবে না, সেগুলো সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। দ্রুত সমস্যা চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত অটিস্টিকদের সেবামূলক কর্মকাণ্ড উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার সহযোগিতা ও সমন্বয় থাকতে হবে। প্রতিবন্ধী ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের নিয়ে সমাজে যে ভুল ধারণা আছে তা আমাদের জরুরি ভিত্তিতে দূর করতে হবে। অভিভাবকদের ক্ষমতায়ন করতে হবে যাতে তারা চিকিত্সা প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে পারে। এ বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে নিয়মিতভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ জাতীয় পর্যায়ে জনসাধারণ ও পেশাজীবীদের মধ্যে প্রচারাভিযান চালাতে হবে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উত্সাহিত করতে হবে এবং প্রণোদনা দিতে হবে যাতে তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যক পেশাজীবী নেয় যারা অটিস্টিকদের আচরণ, যোগাযোগ ও শিক্ষার চাহিদা মেটাতে পারে। গবেষণার পাশাপাশি সর্বাধুনিক রোগনির্ণয় ও চিকিত্সা পদ্ধতি অনুসরণে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আমাদের নতুন আইন, নীতি ও প্রক্রিয়া প্রণয়ন করতে হবে যাতে অটিজম আক্রান্তদের মানবাধিকার বিবেচনায় আসে এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। সব প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত হবে, নিউরোস ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের সমাজের সব ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সাতটি অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম- সচেতনতার অভাব, দ্বিতীয়- বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্তের অভাব, তৃতীয়- সেবার অভাব, চতুর্থ- এসব সেবা দেয়ার মতো প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর অভাব, পঞ্চম- গবেষণার অভাব, ষষ্ঠ- একটি দেশের মধ্যকার সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতার অভাব এবং সর্বশেষ, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এসব কারণে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক (এসএএএন) নামের একটি ছাতার নিচে আমরা সবাই এক হয়েছি, যাতে অটিজম সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়। সম্পদের আদান-প্রদান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে আমাদের সমাজে আরো দ্রুত ও কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। আমাদের সীমিত সম্পদ ও প্রায় একই ধরনের সংস্কৃতির সঙ্গে যুত্সই পদক্ষেপ ও মানসম্পন্ন সেবা চালু, তা এগিয়ে নেয়া এবং অটিস্টিকদের সেগুলো পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আর তার মাধ্যমে সাশ্রয়ী ও সময় উপযোগী সেবাগুলো নিশ্চিত হবে।
ভূ-রাজনৈতিক সীমাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব এখন শুধু একটি পথই নয়, তা খুব জরুরি একটি বিষয়ও। আমি আশাবাদী যে, সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অটিজমের মতো নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের চাহিদা পূরণে যথাযথভাবে কাজ করার একটি উন্নত পথের সন্ধান পাবো। অটিস্টিক ব্যক্তি ও তাদের পরিবারগুলোর প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় আনতে দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায় একত্রিত হয়েছে দেখে আমার খুব আনন্দ হয়। রবীন্দ্রনাথের উক্তির মধ্যদিয়ে আমি বক্তব্য শেষ করছি- “ভিন্নতাকে কিভাবে ধ্বংস করা যায় সমস্যা তা নিয়ে নয়, বরং সকল ভিন্নতাকে অবিকল রেখে কিভাবে একত্রিত করা যায় সেটাই হলো বড় কথা।” (“The problem is not how to wipe out the differences, but how to unite all the differences intact.”)
[গত ১০ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এসএএএন সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য]
লেখক: অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন
