ফাগুনের আগুন ঝরা ফেব্রুয়ারির শেষ ধাক্কা আসে ২৮ ফেব্রুয়ারি। শেষ হয়েছে উত্তাল মার্চ। এপ্রিলের মধ্যভাগে নতুন বছরের আগাম বার্তা থাকলেও দেশবাসীর শান্তি-স্বস্তির কোন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে না। অধিকন্তু পরস্পর অসহিষ্ণু মনোভাব ক্রোধের সংস্কৃতিকে উস্কে দিচ্ছে।
বিএনপি’র ঘাড়ে জামাত কিংবা আওয়ামী লীগের ঘাড়ে গণজাগরণ মঞ্চ সওয়ার হয়েছে; এনিয়ে দু’দিক থেকে জোরালো-সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করা হলেও যথার্থভাবেই অব্যাহত আছে বিতর্ক। কারো বিশ্বাসকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব না নিয়ে নিজের বিশ্বাসের অবস্থানটা যাচাই করে নেয়া অধিক যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক।
নির্বাচনী হিসেবে অক্টোবরে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। জনগণের রায়ের প্রতি পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস রেখে নির্বাচনের ফলাফলের উপর পরবর্তী সরকার কার্যক্রম শুরু করবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতি জানান দিচ্ছে ৯১, ৯৬, ২০০১ এবং ২০০৯-এর নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল চাচ্ছে না বলেই বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে ‘নিশ্চয়তার নির্বাচন’ করতে সচেষ্ট আছে। নির্বাচনকালীন সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভবনেই থেকে যেতে চাচ্ছেন। বর্তমান স্টাইলেই প্রশাসন কাউকে ‘লাঠিপেটা’ কাউকে ‘নিরাপত্তা বলয়ে’ রেখে দ্বি-মুখী আইন ও অবস্থানে রেখে নিয়ম মানার নির্বাচনের ছক করছেন। এ ধরনের একটি একতরফা-নিষ্ফল নির্বাচনের নজির কারো জন্যই ভালো হতে পারে না। এটা বুঝার জন্য বিস্তর জ্ঞান বা ইতিহাস জানার দরকার নেই।
এই বোধোদয় থেকেই প্রধান বিরোধীদলসহ ১৮ দলীয় জোট যে কোন মূল্যে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন চাচ্ছে। আওয়ামী লীগের এ সময়ের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ‘ক্ষমতায় যাওয়াই বিএনপি’র একমাত্র উদ্দেশ্য তাই এত আগ থেকে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে হইচই করছে।’ সরকার যদি মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তারা জয়ী হতে পারবে না তাহলে একদিনও তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার অধিকার নেই।
৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামী রাজনীতি থাকবে না এটা ভাবা কঠিন। ভিন্নমত ও আদর্শের প্রতি রাষ্ট্রের নিয়মতান্ত্রিক নজরদারী থাকবে কিন্তু স্বাধীনতা দিবসে একটি দলের পতাকা মিছিলে পুলিশের গুলি আমাদেরকে অসহিষ্ণু ’৭৫-এর কথা মনে করিয়ে দেয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি বগুড়া-রাজশাহীর রাস্তায় ৩০/৪০ হাজার গাছ কেটে যে অচলাবস্থার তৈরি করা হয় তার প্রতিরোধে পুলিশের গুলিতে শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে। কেন এই প্রতিরোধ, কেন এই প্রাণহানি, তা নিয়ে রয়েছে আলাদা-আলাদা ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থান। ভিন্নমাত্রার অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। প্রবাদ আছে, এপ্রিলে বোকা বানানোর চেষ্টা চলে। চেষ্টা হয় ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের। সুতরাং শিকারীরা সাবধান। প্রাগৈতিহাসিক যুগের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল আমাদের! শীর্ষ দুই নেত্রী পরস্পর মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত সহ্য করছেন না। একুশে টিভির একটি স্ট্রিট প্রোগ্রামে একজন পথচারী বলছেন “দু’নেত্রীকে বলেন, একসাথে বসে শুধু একচাপ চা খেতে, এরপর দেখবেন আমাদের ৬০ ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।”— এ বিশ্বাস আজ লক্ষ-কোটি মানুষের। কে কি বলছে তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে, ভিন্নমত ও পথকে না দেখার ভান করে এগিয়ে যাওয়া কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্ম দিবে না।
ক্ষমতা পালা-বদলের এ সন্ধিক্ষণে এসে সব সময়ের জন্য একটা মানদণ্ড দাঁড় করানো সময়ের দাবি। আসুন আমরা কয়েকটি বিষয়ে দৃঢ় ঐকমত্যে পৌঁছি- কি হবে সরকারি দলের কার্য পরিধি, বিরোধীদল কি করবে - কি করবে না, আমলাদের অবস্থান কি, বিচার বিভাগ কিভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে, কিভাবে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, এটা অতীব জরুরি।
আপনি সরকার কিংবা বিরোধীদল যে অংশেই থাকুন নিজের অবস্থান পরিষ্কার ও যৌক্তিক সমাধানে ভূমিকা নিন। যদি ভাবেন, দেখা যাক কোনিদকে গড়ায় কিংবা অপেক্ষা সুযোগের সদ্ব্যবহারের। তবে জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে না। রাজনৈতিক অস্থিরতায় জান-মালের ক্ষতির হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষায় আসুন একটু ভূমিকা নেই।
লেখক : কবি
[email protected]
