দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিন

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৩
গত রবিবার রাত্রে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয় লক্ষ্য করিয়া গুলি চালানো হইয়াছে। এই ঘটনায় কেহ হতাহত না হইলেও তিনি তখন দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করিতেছিলেন। কে বা কাহারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাইয়াছে— তাহা এখনো জানা যায় নাই। চিহ্নিত করা সম্ভব হয় নাই দায়ী ব্যক্তিদের। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়া সোমবারের ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ৩টি মোটরসাইকেলে করিয়া কয়েকজন যুবক বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের সামনে দিয়া যাওয়ার সময় কার্যালয় লক্ষ্য করিয়া তিন রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার জানাইয়াছেন যে, গুলির খবর পাইয়া পুলিশের একটি দলকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হইয়াছে। তবে বিষয়টি তাহাদের নিকটও স্পষ্ট নহে। ঘটনাটি উদ্বেগজনক শুধু নহে, অগ্রহণযোগ্যও বটে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার একটু আগেই সেইখানে ১৮ দলীয় জোটের বৈঠক হইয়াছে। ফলে বিএনপি চেয়ারপার্সন ছাড়াও দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতাও সেইখানে ছিলেন। অতএব, কার্যালয়ের সামনে তখন কর্মীদের ভিড় থাকা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যে সেইখানে ছিলেন তাহাও সহজেই অনুমেয়। তাহাদের উপস্থিতিতে গুটিকয় দুর্বৃত্ত কার্যালয়ে গুলি করিয়া কিভাবে পালাইয়া যাইতে পারিল— তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। অন্তর্নিহিত কারণ বা রহস্য যাহাই হউক না কেন— ঘটনাটি যে অত্যন্ত নিন্দনীয় তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক। এই ঘটনা যে তাহাতে ঘৃতাহুতি করিবার শামিল— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, বেগম খালেদা জিয়া দেশের অন্যতম বৃহত্ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপার্সন শুধু নহেন, তিনি তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে বিরোধী দলের নেতাও বটে। অতএব, তাঁহার নিরাপত্তা ও মানমর্যাদার বিষয়ে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য কিংবা উদাসীনতা দেখাইবার কোনো অবকাশ নাই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকিতেই পারে। চলিতে পারে তুমুল বাকবিতণ্ডাও। কিন্তু এইখানে কোনো প্রকার ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার স্থান নাই। অবকাশ নাই পারস্পরিক অশ্রদ্ধা প্রকাশ বা প্রদর্শনের। তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার কথা বলিতে গিয়া আমরা প্রায়শ উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলির দৃষ্টান্ত দেখাইয়া থাকি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যও কোনো অংশে কম সমৃদ্ধ নহে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আমরা অহিংস ও সহিংস উভয় পন্থায় আন্দোলন করিয়াছি। দীর্ঘ সংগ্রাম করিয়াছি পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও। ইহার জন্য জেল-জুলুমও সহ্য করিতে হইয়াছে। কিন্তু সবই হইয়াছে আইনানুগভাবে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, আক্রমণ কিংবা পারস্পরিক মর্যাদাহানির উদাহরণ সেইখানে বিরলই বলিতে হইবে। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। সরকার ও বিরোধী দল নির্বিশেষে রাজনীতিকরাই হইলেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। সঙ্গত কারণেই রাজনীতিকদের পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ ও সহিষ্ণুতা না থাকিলে এমনিতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করিতে পারে না। দেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে পারস্পরিক এই সম্মানবোধ ও সহিষ্ণুতা আরও বেশি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। সকলেরই মনে রাখা দরকার যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নহে এবং কোনো সরকারই শেষ সরকার নহে। অতএব, যাহা কিছুই আমরা করি না কেন— ভবিষ্যতে তাহার প্রতিক্রিয়া কী হইবে বা হইতে পারে তাহাও অবশ্যই বিবেচনায় রাখিতে হইবে। আমরা আশা করি, বিরোধী দলের নেতার নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হইবে। সর্বোপরি, গুলিবর্ষণের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অনতিবিলম্বে দাঁড় করানো হইবে বিচারের কাঠগড়ায়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন