কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ীতে প্রতি বত্সরের ন্যায় এইবারও দোল পূর্ণিমার তিথিতে সাধুসঙ্গসহ উদযাপিত হইয়া গেল পাঁচদিনব্যাপী পূর্ণিমা উত্সব। দেশ-বিদেশ হইতে লালন ভক্তরা এই উপলক্ষে প্রতিবত্সর ছেঁউড়িয়ার এই স্মরণোত্সবে বা মিলন মেলায় অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন। দেশের ভিতর ও বাহির হইতে লালনভক্ত বাউল সাধকেরা তাহাদের শিষ্য, প্রশিষ্য ও সাধনসঙ্গিনী লইয়া বাল্যসেবা, পূণ্যসেবা, উঠানজ্ঞান, গুপ্তজ্ঞান ইত্যকার নানান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইয়া মানবতার রসে সিঞ্জিত সাধক লালন সাঁইয়ের প্রতি গভীর ভক্তি নিবেদন এবং সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে তাঁহার দর্শন বা ভাবনার সহিত একাত্ম হন। মরমী সাধক লালন সাঁইয়ের প্রতি আমাদের সমাজের প্রীতি, অনুরাগ, কৌতূহল ও অনুসন্ধিত্সা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহার কারণ এই যে, লালন লৌকিক বাঙলার মরমী সাধনার এক প্রবাদপ্রতিম প্রধান পুরুষ।
সংস্কার, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, শাস্ত্রশাসিত গ্রামীণ সমাজে জন্মলাভ করা সত্ত্বেও তিনি একজন আলোকিত মানুষ হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও শাস্ত্রাচারের নিকট কখনই পরাভব মানেন নাই। বরং মানব ধর্মের উচ্চকিত মহিমাকেই তিনি তাঁহার গান ও সাধনার মধ্য দিয়া ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। সকল প্রকার কুসংস্কার, জাতের নামে বজ্জাতি ও ধর্মের নামে অধর্মের ব্যাপারে তিনি সদা ছিলেন খড়্গহস্ত। বিশ্ব সৃজনের গুপ্ত রহস্য আর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করিয়া গিয়াছেন। এমনকি মানুষের উপর কোন প্রকার শোষণ-বঞ্চনা ও অন্যায় চাপাইয়া দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সঙ্গী-সাথী লইয়া রুখিয়া দাঁড়াইতেও তিনি পিছপা ছিলেন না। মোদ্দাকথা, মানুষকেই তিনি এই বিশ্ব চরাচরের আধার হিসাবে মানিতেন এবং এই বিশ্বে মানুষ্য সৃষ্টির পিছনে স্রষ্টা বা দয়াময়ের যে অপার রহস্য রহিয়াছে উহা সকলকে অনুধাবন করিতে শিক্ষা দিতেন। কোন প্রকার দুনিয়াবী ভোগ-বিলাস নহে কেবলই সৃষ্টিকর্তাকে অনুসন্ধান করিবার মধ্যেই মানুষের জীবনের সার্থকতা ইহাই তিনি মনে করিতেন। এই দর্শনের আলোকে অজস গান রচনা করিয়াছেন লালন সাঁই, যাহা অধ্যাত্ম সাধকদের নিকট অমূল্য সম্পদ হিসাবে বিবেচিত।
এই যুগন্ধর লোকপ্রতিভা এক অনন্য ও অভিনব সহজ সাধনার ধারা প্রবর্তন করিয়াছিলেন। ‘মানুষ সত্যের’ উপাসক ছিলেন লালন সাঁই আর তাই তাঁহার দর্শনে ছিল শাস্ত্রনিরপেক্ষ সকল মানুষের মিলন ও ঐক্যের নির্যাস। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ, চরিত্রবান, সত্যাশ্রয়ী, অসাম্প্রদায়িক, সংস্কারমুক্ত, তত্ত্বজ্ঞানী, মদগুরু, প্রচারবিমুখ, মাতৃভক্ত, কর্তব্যনিষ্ঠ ও দৃঢ়চিত্ত সংগ্রামী। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবধর্মের প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিলেন বলিয়াই তিনি সম্প্রদায়-সম্প্রীতির প্রবক্তা হইয়া উঠিয়াছিলেন। আর ঐ একই কারণে এই দেশে লালন সাঁই হিন্দু, মুসলমান মিলনের অগ্রদূত হইতে পারিয়াছিলেন। তিনি জাতিভেদ মানিতেন না। আর সেই জন্যই সকল ধর্মের লোকেরাই তাঁহাকে আপন বলিয়া জানে। রবীন্দ্রনাথের সহিত তাঁহার সাক্ষাত্ ঘটে নাই বটে, তবে এই মানবভক্ত অনন্যসাধারণ সাধকপুরুষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত আগ্রহী হইয়া উঠিয়াছিলেন। আর সেই কারণেই লালনের দর্শনের প্রভাব আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার উপর লক্ষ্য করিয়াছি। তিনি লালনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাও নিবেদন করিয়াছেন তাঁহার বিভিন্ন লেখায়।
বাঙলার মাটিতে জন্মগ্রহণকারী এই সাধক-পুরুষের দর্শন এবং উহার আবেদন শুধু বাঙলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই। তাঁহার মানব প্রেম ও মানবধর্মের উদার উচ্চকিত বাণী বাঙলার ভৌগোলিক চৌহদ্দী পার হইয়া বিশ্বময় ছড়াইয়া গিয়াছে। জগত্ সংসারের আর আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে পরিচিত মানুষের সৃষ্টিরহস্য, কর্তব্য আর গন্তব্য সম্পর্কে এত নিবিষ্টচিত্তে যাঁহারা সাধনা করেন তাঁহারা যুগ-কালের গণ্ডি পার হইয়া চিরায়ত আসন লাভ করেন নিশ্চয়ই। প্রতি বত্সর ছেঁউড়িয়ায় লালনভক্তদের যে ঢল নামে উহাতে এই কথার সত্যতার প্রমাণ মিলে বৈ কি!
