বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তার প্রতিকারের উপায় সম্পর্কিত দুর্দান্ত একটি বই ‘ফিক্সিং ক্লাইমেট; দ্যা স্টোরি অব ক্লাইমেট সায়েন্স অ্যান্ড হাউ টু স্টপ গ্লোবালওয়ার্মিং’। বইটির লেখক প্রখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানী ওয়ালেস ব্রোকার, সহযোগী লেখক রবার্ট কুনজিগ। বৈশ্বিক উষ্ণতার নানা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং এর সমাধানের বিভিন্ন উপায়ের একটি সংক্ষিপ্ত সার এ বইটিতে হাজির করেছেন লেখকদ্বয়। ওয়ালেস ব্রোকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আর্থ অ্যান্ড এনভাইরোনমেন্টাল সায়েন্স’ বিভাগের অধ্যাপক। তার গবেষণাতেই পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার প্রাথমিক নিয়ামক ‘থার্মো-হ্যালাইন কনভেয়র’ আবিষ্কৃত হয়। থার্মো-হ্যালাইন কনভেয়র হলো সমুদ্র স্রোতের একটি জালিকা বা নেটওয়ার্ক, যা ভূপৃষ্ঠের উষ্ণ ও শীতল জলের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে।
ব্রোকার তার লেখনিতে বার বার যা বলছেন তাহলো, আমাদের জলবায়ু ব্যবস্থা একটি ঘুমন্ত দানব, তাকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে আমরা আমাদের ধ্বংসই ডেকে আনছি। গত ১০ হাজার বছর বিশ্বের জলবায়ু তুলনামূলকভাবে বেশ একটি শান্ত পরিস্থিতিতে রয়েছে (শেষ বরফ যুগের পর থেকে)। এই আপেক্ষিক শান্ত জলবায়ুর সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্বে কৃষি ও সভ্যতার পত্তন ও বিকাশ সাধন করেছে মানবজাতি। এভাবে জলবায়ু দানবটির লম্বা ঘুমের সুযোগ নিয়েছি আমরা। তবে কয়লা, তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর আধুনিক মানবসভ্যতায় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের অতি নির্গমন জলবায়ু ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং ঘুমন্ত দানবটিকে জাগিয়ে তুলছে। এর ফলাফল হতে পারে আকস্মিক ও তীব্র বিধ্বংসী।
বিপরীতে আমাদের সাধারণ ধারণা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ধীরে ধীরে হয় এবং একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা ঘটতে কয়েক শতাব্দি, এমনকি এক সহস্রাব্দও লেগে যেতে পারে। কিন্তু জলবায়ু বিজ্ঞান বলছে, পৃথিবীর ইতিহাসে জলবায়ু পরিবর্তন অত্যন্ত আকস্মিকও হতে পারে, অতীতে এমনটি ঘটেছেও। এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে ‘ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াস’ (Younger Dryas) বরফ যুগ, একটি শীতল সময়কাল, যা বর্তমান সময়কাল থেকে ১২৮০০ বছর আগে শুরু হয়ে ১১৫০০ বছর আগে শেষ হয়। তার মানে এ যুগের স্থায়িত্ব ছিলো মাত্র ৭০০ বছর।
‘বরফস্তর পরিমাপে দেখা গেছে ইয়ঙ্গার ড্রাইয়াস যুগের শেষ দিকে উষ্ণতার ধরন ছিলো তীব্র অনিয়মিত, বরফস্তর হঠাত্ করেই অর্ধেকে নেমে আসলো... বেশিরভাগ বড় পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র কয়েক বছরে।’ (পৃষ্ঠা ১৪১)
সুতরাং বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদিতে দেখা যাচ্ছে, বরফ যুগের সমাপ্তি ঘটানোর জন্য উল্লেখযোগ্য মাত্রার জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই ‘মাত্র’ কয়েক বছরের ঘটনা; এর জন্য কয়েক শতক বা এমনকি কয়েক দশকও লাগেনি। এই বাস্তবতা আসলে আমাদের ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত বহন করে। যেভাবে আমরা কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়াচ্ছি তাতে বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পুঞ্জীভবন বৃদ্ধির হার পৃথিবীর ইতিহাসে যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি।একই হারে বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি বাড়তে থাকে তাহলে সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের সময় ও সক্ষমতা কোনটাই মানবজাতি এখনো অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে বিশ্বে মরুকরণ, ফসলহানি ও উত্পাদন হ্রাস এবং দুর্ভিক্ষ যে মাত্রায় বাড়বে তাকে এক কথায় বলা যায় ‘মহাবিপর্যয়’।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। জলবায়ু বিজ্ঞানের এটি একটি স্বতন্ত্র শাখা, যাতে গবেষণাপ্রাপ্ত ফলাফল বলছে বড়সড় বিপর্যয় ঘটতে পারে এবং তা এগিয়ে আসছে বেশ দ্রুতগতিতে।
১৯৮০ সালের দিকে ব্রোকারের এক সহকর্মী রিচার্ড ফেয়ার ব্যাঙ্কস দাবি করেন, নানা উপাত্ত ঘেঁটে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যতের একটি সময়কাল নির্ধারণ করতে পারেন, যে সময়টাতে প্রতি ১০০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের স্ফীতি বাড়বে ২০ মিটার হারে। (পৃষ্ঠা ১৭১) যদি ২০ মিটার হারে বেড়ে যায় তাহলে নিশ্চিত বাংলাদেশ ডুবে যাবে।
একটি নিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছাতে আমাদের কী দরকার, বিশ্বের সব রাষ্ট্র, সরকার বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে নরওয়ে ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পদচিহ্ন অনুসরণ করতে হবে। এর বাইরে এই সমস্যার (কাবন-ডাই-অক্সাইড) আর কোন উপায় নেই। সব রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন শীর্ষ (Emissions cap) বেঁধে দিতে হবে অথবা নির্গমনের উপর সরাসরি কর আরোপ করতে হবে। ( পৃষ্ঠা ২৬৬)
ব্রোকারের এই উপসংহারে একমত সিংহভাগ জলবায়ু বিজ্ঞানী। জলবায়ুর ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন রুখে দিতে হলে কার্বন নির্গমন কমাতে হবে। দ্রুততার সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির স্থলাভিষিক্ত করতে হবে নিউক্লিয়ার, বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি ইত্যাদি বিকল্প শক্তির উত্সকে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করতে প্রয়োজন বিশাল বিনিয়োগ এবং এই বিনিয়োগের পুঁজির যোগান দেবে নির্গমন কর বা কার্বন ট্যাক্স। আমাদের মধ্যে যারা এই পৃথিবীর ভবিষ্যত্, আমাদের উত্তরসূরিদের ভবিষ্যত্ বাসযোগ্য বিশ্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন তাদেরকে আজ অবশ্যই ভাবতে হবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই বিশাল পরিবর্তন আনার উপায় কী হতে পারে।
লেখক:হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস থেকে গ্রাজুয়েট করেছেন www.goodbyebangladesh.blogspot.com
