স্বাস্থ্যকথা

হার্টের আর্টারী ব্লকেজ রোগীদের নতুন আশার আলো

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৫
বিশ্বের এক নম্বর মরণব্যাধি হূদরোগ। কোনরকম পূর্বাভাস ছাড়াই যে কোন সময় এটি কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে সংক্রামক ব্যাধির পরিমাণ কমে যাওয়ার সাথে সাথে অসংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, ক্যান্সার মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ মৃত্যুর কারণ হলো এসব অসংক্রামক ব্যাধি, যার অন্যতম হচ্ছে করোনারি হূদরোগ এবং এটি শতকরা প্রায় ২৭ ভাগ মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর লাখ লাখ লোকের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এদের মধ্যে ২৫ ভাগের মৃত্যু হয় হাসপাতালে পৌঁছার আগেই। হার্ট অ্যাটাক হয়েও অনেক সময় বেঁচে থাকতে হয় নানা অক্ষমতা আর হঠাত্ মৃত্যুর ভয় নিয়ে। বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ২০-২৫ জন উচ্চ রক্তচাপে এবং শতকরা ১০ জন করোনারি হূদরোগে ভুগছেন। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন পরে তেমনি রোগাক্রান্ত হলে প্রয়োজন চিকিত্সার। তাই হূদরোগের চিকিত্সা হিসেবে প্রচলিত বহুল আলোচিত দুটি পদ্ধতি- বাইপাস ও স্ট্যান্টিং। এ দুটিই অপারেশন। অনেক সময় ডাক্তাররা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়ে দেন যে রোগীর বাইপাস সার্জারি বা স্ট্যান্টিং করার মতো অবস্থা নেই বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সার্জন অপারেশন করলেন না। আবার এমনিও দেখা গেছে, ৮০ বছরের বৃদ্ধের ১টি আর্টারিতে ব্লক থাকায় রিং বসাতে গিয়ে অসফল বা ব্যর্থ। তাকে এই বয়সে বাইপাস করা রিস্ক অথবা রোগীও এই বয়সে অপারেশন করাতে অনিচ্ছুক। এমনিও দেখা গেছে অপারেশন বা রিং বসানোর কিছুদিনের মধ্যে পুনরায় ব্লকেজ হয়েছে। এসময় পুনরায় অপারেশন করা অপরিহার্য কিন্তু করা রিস্ক। হেপাটাইটিস বি পজিটিভ থাকলে সার্জনরা অপারেশন করতে অনিচ্ছুক। হার্টের ব্লকেজের সাথে পায়ের আর্টারিতে অত্যধিক ব্লক থাকায় অপারেশন করা কষ্টসাধ্য, তাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতির চিকিত্সা দেয়া যাচ্ছিল না, এরকম পরিস্থিতিতে কি রোগীরা নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন? নিশ্চয় নয়। অন্যথায় বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প কোন পথ খুঁজবেন । অপারেশন বা কাটা-ছেঁড়া ছাড়াও যে বিভিন্ন পদ্ধতিতে হূদরোগের চিকিত্সা করা সম্ভব- এক্ষেত্রেও প্রচুর সফলতার প্রমাণ রয়েছে- এ কথাগুলো এখন কারও মেনে নিতে আপত্তি থাকবার কথা নয়। হলিস্টিক পদ্ধতিতে (ডায়েট ম্যানেজমেন্ট, স্ট্রেস ফ্রি টেকনিক, মেডিটেশন, যোগ ব্যায়াম, প্রাণায়াম, নিউরোবিক, আকুপ্রেশার ও ইসিপি) চিকিত্সা হচ্ছে এখন উন্নত বিশ্বেও। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে প্রচুর। হূদরোগীদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে এবং নিয়মিতভাবে কিছু যোগ ব্যায়াম করালেও রোগের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়ে থাকে। এগুলো অনুসরণ করলে নতুন করে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে না এবং ধমনীর ব্লক বা বাঁধা সরিয়ে হূদপিন্ডে বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করে থাকে। এটাকেই আমরা বলে থাকি বিকল্প পদ্ধতি। আমেরিকার ডা. ডীন অরনিশই প্রথম এই পদ্ধতি শুরু করেন এবং এর ব্যাপক সফলতা পান। ভারতের ডা. সতীশ গুপ্তার নেতৃত্বে কার্ডিওলোজিস্ট, যোগব্যায়ামবিদ, মেডিটেশন এক্সপার্ট, ডায়েটিশিয়ান এর সমন্বয়ে আর্টারি ব্লকেজ রোগীর উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। যার অধীনে সুস্থ হয়েছেন প্রায় ২০০০০ হাজারের অধিক হূদরোগী। এই প্রোগ্রামের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এপিজে আবুল কালাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাক্তাররা একেকটি সমস্যার সম্মুখীন হন, সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা ও গবেষণা করেন। এভাবেই এক সময় তারা ওই সমস্যার সমাধান বের করেন। ধাপে ধাপে চিকিত্সার অগ্রগতি সাধিত হয়। কেবল হূদরোগ চিকিত্সাতেই নয়, অসংক্রামক বহু রোগ বিশেষত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মাইগ্রেন রোগের চিকিত্সায় এই বিকল্প পদ্ধতির সাফল্য আজ পরীক্ষিত। পৃথিবীর প্রতিটি নতুন চিকিত্সা পদ্ধতিই এভাবে ধাপে ধাপে সমস্যা অতিক্রম করে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ারই ইতিহাস। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ডিজি হেল্থ অটাশেড টু এফএমএ [email protected]