শেয়ারবাজার লইয়া স্বস্তি ফিরিয়া আসিবে কবে? এমন প্রশ্ন এখন অনেকেই করিয়া থাকেন। যাহারা এই বাজারে বিনিয়োগ করেন নাই, তাহারাও শেয়ারবাজার লইয়া স্বস্তিতে নাই। তাহাদের আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, পরিচিতজনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন বলিয়াই শেয়ারবাজারের নাম লইলে অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া পড়েন। এই বাজারে টাকা খাটাইয়া ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হইয়াছেন। কারসাজি করিয়া তাহাদের টাকা লুট করিয়া নেওয়া হইয়াছে। কিন্তুু তাহারা প্রতিকার পান নাই। তাহার পর কয়েক বত্সর কাটিয়া গিয়াছে। মন্দা বাজারে যোগ হইয়াছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। যাহার কারণে নষ্ট হইয়া গিয়াছে বহু কর্মদিবস। ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে ব্যবসা-বাণিজ্য। যেইসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রহিয়াছে, সেইসব কোম্পানির ব্যবসা ভাল না হইলে শেয়ারের দাম বাড়িবে কিভাবে? ঐসব কোম্পানি যে ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া শিল্পকারখানা স্থাপন করিয়াছেন, সেই ব্যাংকের দায়দেনা শোধ করাও এখন কষ্টকর হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহাতে ঋণদাতা ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। যাহার প্রভাব পড়িতেছে ঐ ব্যাংকের শেয়ারমূল্যেও। গত রবিবার শেয়ার বাজারের সূচক বিগত সাড়ে তিন বত্সরের মধ্যে সর্বনিম্নে চলিয়া যায়। এই কথাগুলির অবতারণা করিলাম এই জন্যই যে, আমাদের চোখের সামনের এই চিত্র গোটা অর্থনীতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিয়া থাকে। ইহাতে স্পষ্ট হইতেছে যে, আমাদের অর্থনীতি ক্রমশই তলানির দিকে যাইতেছে। আর পুঁজিবাজারকে বলা হইয়া থাকে অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ।
বিশ্লেষকরা বলিয়াছেন, ‘দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়া আসে নাই। ইহার কারণ হিসাবে বলা হইয়াছে, তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানিরই আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রহিয়াছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে কোম্পানিগুলি এই ধরনের প্রবণতা হইতে বাহির হইতেছে না।’ এই বক্তব্য হইতে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, ঐসব কোম্পানির মৌল ভিত্তি দুর্বল এবং প্রকৃত তথ্য আড়াল করা হইয়াছে। বিনিয়োগকারীদের ভুল তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছে। ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করিয়া বিনিয়োগ করিয়াছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। ফলে, তাহারা লাভবান হইতে পারেন নাই। তলানিতে পড়িয়া থাকা শেয়ারবাজারও ইহাই প্রমাণ করে যে, এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নাই। তাহা হইলে আস্থা ফিরিয়া আসিবে কিভাবে? আস্থা না ফিরিলে স্বস্তিও ফিরিবে না। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কোন রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করা ঠিক হইবে না। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজেরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়া সংশ্লিষ্ট মহলে নানান প্রশ্ন রহিয়াছে। আর এই সব প্রশ্ন আপনা-আপনিতেই আসে নাই। বিভিন্ন সময়ে খবর হইয়াছে যে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় নাই। কোম্পানির সম্পদমূল্য যাহাই থাকুক না কেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশ করিয়া প্রিমিয়াম বাড়াইয়া ধরিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে বলিয়া বিনিয়োগকারীরা বলিতেছেন। ‘উপর মহলে’র চাপে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় নাই। ফলে, অযোগ্য কোম্পানির শেয়ারও বাজারে চলিয়া আসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগকারীরা। সব হারাইয়া তাহাদেরকে রাস্তায় নামিতে হয়। বিক্ষোভ করিতে হয়। কেহ কেহ আত্মাহুতিও দিয়াছেন। কিন্তুু তাহাদের কথা বিবেচনায় রাখিবার দায় পড়িয়াছে কাহার। সেই কারণেই বিক্ষোভ করিতে গিয়া তাহারা নির্যাতিত হইয়াছেন। তাহাদেরকে দমাইয়া দেওয়া হইয়াছে। আর যাহারা লুট করিয়া নিয়াছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, তাহারা দিব্যি বীরদর্পে চষিয়া বেড়াইতেছেন। তাহাদের টিকিটি স্পর্শ করিবার ক্ষমতা আছে কাহার? অর্থমন্ত্রী নিজেও বলিয়াছেন ‘ক্ষমতাবান’দের হাত রহিয়াছে এই বাজারে। তাহা হইলে ক্ষমতাহীনদের করিবার কিইবা আছে। তাহারা শুধুই হারাইবেন-ইহাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তুু তাহাদের হারাইতে গিয়া গোটা অর্থনীতি যেন হারাইয়া না যায়, সেইদিকে খেয়াল না রাখিলে উপর-নিচ কেহই লাভবান হইবে না। তাই ‘ক্ষমতাবান’দের নিবৃত্ত করিয়া নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে শেয়ার বাজারকে পরিচালিত করিতে হইবে। সকল দিক এবং সকলের কথা বিবেচনা করিয়াই পদক্ষেপ লইতে হইবে এবং ইহাই জরুরি।
