উত্তর কোরিয়া প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় প্রবেশ করিয়াছে বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। বেশ কিছুদিন ধরিয়া এই অঞ্চলে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর নিয়মিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া গত মাসে শুরু হয়। মহড়া চলিবে এপ্রিলের শেষ নাগাদ। যদিও এই মহড়া প্রতিরক্ষামূলক, তথাপি ইহার পর হইতে প্রায় প্রতিদিন দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়া আসিতেছে উত্তর কোরিয়া। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বি-২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান আকাশে উড়ানোর পর ঐ দিন রাত্রেই পিয়ংইয়ংয়ের শীর্ষ নেতা কিম জং উন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন শুক্রবার মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাক করিয়া ক্ষেপনাস্ত্র মোতায়েন করা হয়। যাহাতে যে কোন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন ভূখন্ড, প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই ও গুয়াম দ্বীপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে হামলা চালানো সম্ভব হয়।
এই প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়। শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জয়েন্ট রেসপনসিবিলিটি বা যৌথ দায়িত্বশীলতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। ইহার আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালাইলে চীন হতাশা ব্যক্ত করে। রাশিয়াও বর্তমান প্রেক্ষিতে উত্তর কোরিয়াকে মাথা ঠান্ডা রাখার পরামর্শ দিয়াছে। চীন ও রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত মিত্র। তাহারা এই রকম পরিস্থিতিতে আসলে সতর্কবার্তা দেওয়ারই চেষ্টা করিয়াছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেল বলিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া কোন উস্কানিমূলক কর্মকান্ডে জড়িত নহে। যৌথ মহড়া একটি স্বাভাবিক ও চলমান বিষয় এবং ওয়াশিংটন ও তাহার মিত্ররা শান্তি বজায় রাখার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার হামলার হুমকিকে পরোয়া না করিয়া বলিয়াছে যে, এইরূপ হুমকি নতুন নহে। শুধু তাই নহে, গত সোমবার দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পার্ক জিয়ুন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করিয়া উত্তর কোরিয়ার যেকোন উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়াছেন।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ফাঁকা কলস বাজে বেশি। মাঝেমধ্যে উত্তর কোরিয়া যে হুমকি দেয়, তাহাকে ইহার সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। প্রতিরক্ষামূলক সাপ্তাহিক দি এশিয়া প্যাসিফিক-এর সম্পাদক জেমস হার্ডি মনে করেন, মার্কিন ভূখন্ড, প্রশান্ত মহাসগরের হাওয়াই ও গুয়াম দ্বীপ কিংবা কোরিয়ান উপদ্বীপের যেসব অঞ্চলে মার্কিন সৈন্য অবস্থান করিতেছে, সেখানে উত্তর কোরিয়ার হামলা করার তেমন সুযোগ ও ক্ষমতা নাই। কেননা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেখানে যথেষ্ট শক্তিশালী। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম বি-২ বিমানের যে মহড়া দিয়াছে তাহা রাডার ফাঁকিও দিতে পারে। অর্থাত্ যুদ্ধ বাধিলে ইহাতে উত্তর কোরিয়ারই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইবার কথা। উত্তর কোরিয়া এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন বলিয়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণেই অধিক প্রয়াসী। প্রথাগত সমরাস্ত্র আর মধ্যমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্রে তেমন কাজ হইবার কথা নহে। তাই দেশের বিভিন্ন স্থানে পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা হইতে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে উত্তর কোরিয়া। তবে সম্ভাব্য কোরীয় যুদ্ধে চীন ও রাশিয়া জড়াইয়া পড়িলে পরিস্থিতি কিরূপ দাঁড়াইবে তাহা বলা মুশকিল।
১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ কোন শান্তিচুক্তি ছাড়াই শুধুমাত্র অস্ত্র বিরতির মাধ্যমে শেষ হয়। তাই পরোক্ষভাবে ও টেকনিক্যালি দুই কোরিয়া সব সময় যুদ্ধাবস্থায়ই থাকিলেও সর্বাত্মক যুদ্ধের আর কোন নজির নাই। সাম্প্রতিককালে ২০১০ সালে উত্তর কোরিয়া সমুদ্রসীমার নিকট দক্ষিণ কোরীয় একটি দ্বীপে বোমা হামলা চালায়। ইহাতে দুই সেনাসহ চারজন নিহত হয়। ইহা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এদিকে সাম্প্রতিক মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতির বড় দিক হইল, বিশ্ববাণিজ্যের স্বার্থরক্ষা ও বিভিন্ন কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় যে কোন সময়ের তুলনায় সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এমতাবস্থায় আতঙ্কিত উত্তর কোরিয়া ও তাহার মিত্ররা একটুতেই বেশি হৈচৈ করিবে ইহাই স্বাভাবিক।
