পানির দেশে পানির জন্য হাহাকার

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৩৮
গান, প্রাণ, পানি ও পাখির দ্যাশ বা ধান ও মাছের দ্যাশ হিসাবে খ্যাত সাড়ে আট হাজার বর্গকিলোমিটারের দুই কোটি লোকের বসবাস হাওর ভাটি বাংলায়। এ এলাকা বছরে ছ’ মাস থাকে পানির নিচে, আর বাকি ছ’ মাস শুকনা, শুষ্ক মৌসুম। বর্ষায় যেখানে চারদিকে শুধু পানি আর অথৈ থৈ-থৈ পানি, শুকনায় সেখানে সবুজের সমারোহ। বিরাট, বিশাল বৈপরীত্য। ফাল্গুন-চৈত্র মাসের অবস্থা, পানির জন্য হাহাকার, বাস্তবে চর্ম-চক্ষুতে না দেখলে অবিশ্বাস্য। হাওরের নদী-নালায়, বিল-ঝিল আর খাল-ডোবার তলানিতে জমে থাকা কিছু পানিই হচ্ছে শুকনো সময়ের জলের উত্স। উজান থেকে নেমে আসা নদীর ক্ষীণ ধারা আর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার টান হাওরে পানি প্রাপ্তির উপর প্রভাব ফেলে। এসব পানিই হচ্ছে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা, কৃষি, যোগাযোগ ও গৃহস্থালি কার্যক্রমের একমাত্র উত্স। পানির এসব উত্সকে কেন্দ্র করেই হাওরের বিভিন্ন স্থানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। প্রকৃতি, জলবায়ু ও জৈবিক বিবর্তনে হাওর ভাটি বাংলায় পানির এ সব উত্স আজ মৃত প্রায়। বর্ষায় এ পানি যেমন হাওরবাসীর জন্য আপদ, শুকনায় পানির অভাবে তাদের জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত, সবকিছু থেমে যাওয়ার অবস্থা। হাওরের প্রত্যেকটা জনবসতির সাথে নিজস্ব পানির উত্স ছিল। বিশাল এ হাওর এলাকায় প্রায় ৩৬ হাজার বিল, ঝিল, পুকুর, ডোবা, খাল, গর্ত আছে। এগুলোর পানি হাওরবাসী তাদের নিত্য ব্যবহার্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করতো। কিন্তু এ সব জলাশয় ভরাট, মুজে, চাষে বা নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। এ পানি আবার ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজে। হাওরের গোচারণ ভূমিগুলো উফশী ধানের সবুজ নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরে উঠেছে। ফলে পানির ব্যবহার বেড়েছে অনেকগুণ। বিপরীতে পানি প্রাপ্তির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমেছে। কৃষি বিশেষত উফশী ধান চাষে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। শুনে আশ্চর্য হবেন যে, এক কেজি চাল উত্পাদন করতে প্রায় তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন। ফলে হাওরের নদীর শাখা-প্রশাখা বা জলাশয়ের পাড়ে গড়ে উঠা জীবনযাত্রা সবচেয়ে ব্যাহত হচ্ছে। এ বছর হাওরে দীর্ঘ খরা তা আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়ির পাশের ডোবা, পুকুর শুকিয়ে গেছে, নদীও পানিশূন্য। সারারাত ঝির ঝির করে নদীর তলায় জমে থাকা পানি সকালে পাম্পের সাহায্যে টেনে তুলে জমিতে দেয়ার চেষ্টা চলে। সেচ-নালার বাঁকে বা গর্তে কিছু পানি জমে থাকে। এ পানিই হচ্ছে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে অধিকাংশ হাওরবাসীর গৃহস্থালি, নিত্য ব্যবহার্য, রান্না , গোছলের পানির উত্স। মগ দিয়ে পানি নিয়ে তারা ‘কাক গোছল’ কোনরকমে সারেন। কোন কোন মহিলার সপ্তাহেও পানির অভাবে গোছল হয় না। পানের জন্য টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করলেও রান্নায় সেচ-নালার পানিই ভরসা। টিউবওয়েলের পানি নাকি রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায় না। কোন গ্রামে অপর্যাপ্ত পুকুর থাকলেও ভরাট হওয়ায় বা অতি ব্যবহারে পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পরে। এ অবস্থায় চারদিকে রোগ-বালাই, চর্ম রোগের বিস্তার ঘটে। গো মড়কও দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পরে মহিলা ও শিশুরা। আগের দিনে জনদরদী জমিদার বা একান্নবর্তী পরিবারগুলো নিজস্ব উদ্যোগে পুকুর বা দীঘি খনন ও মেরামত করতো। এখন একক পরিবারগুলোর সে আর্থিক অবস্থা না থাকায় নতুন পুকুর খনন তো দূরের কথা, পুরোনোগুলোই সংস্কার করতে পারছে না। পানির দেশে পানির এ হাহাকার লজ্জাজনক। হাওর ভাটি এলাকার অভাব, নিদান বা ক্রান্তিকাল হচ্ছে ফাল্গুন-চৈত্র মাস। বর্তমান সরকারের এ সময়ে কর্মসংস্থান কর্মসূচির অধীনে জরুরীভাবে পুকুর-ডোবাগুলো খনন করা যেতে পারে। সরকার, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে আমার আবেদন, দয়া করে হাওরে, গ্রামের পাশে অবস্থিত হাওরের “পানি উদ্যান” ৩৬ হাজার বিল, ঝিল, পুকুর, ডোবা, নালাগুলো খনন করে দেন। এর ফলে নিত্যব্যবহার্য পানির অভাব পূরণ হবে। কৃষি, মত্স্য, প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং বন্যা বিলম্বিত হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পানির ছোবল মারাত্মক ও ভয়াবহ, পানি নিয়ে অবহেলা নয়। হাওর “পানি উদ্যান” এ পানি থাকতে না দিলে সেও তার পাড়ে কাউকে থাকতে দিবে না, এটাই বাস্তব ও সত্যি। লেখক : কৃষি প্রকীেশলী, সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার, ফার্মগেট, ঢাকা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন