পুলিশের উপর বর্বরোচিত হামলা প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৬
সারাদেশে পুলিশের উপর বর্বরোচিত ও নৃশংস হামলা এখনও অব্যাহত রহিয়াছে। গত মঙ্গলবার হরতাল চলাকালে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার হাজির মোড় এলাকায় দিনাজপুর পুলিশের বিশেষ শাখার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুস সবুরের ওপর হামলা চালায় হরতাল সমর্থকরা। হামলাকারীরা তাঁহাকে প্রচণ্ড মারধর করে এবং তাঁহার মাথা থেঁতলাইয়া দেয়। বর্তমানে তাঁহার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইহার আগে রবিবার রাজশাহীতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাইয়া পুলিশের শিক্ষানবিশ উপ-পরিদর্শক (পিএসআই) মকবুল হোসেনের এক হাতের কব্জি ও অন্য হাতের আঙ্গুল উড়াইয়া দেওয়া হয়। পরদিন সোমবার রাজশাহীর শালবাগান এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের উপ-পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলমের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ইট দিয়া থেঁতলাইয়া দেওয়া হয়। এই ভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হরতাল সমর্থকদের ভয়াবহ ও মর্মস্পর্শী হামলা চলিয়া আসিতেছে, যাহা খুবই দুঃখজনক। যাহারা জনগণকে নিরাপত্তা দিবেন, তাহারাই আজ সবচাইতে নিরাপত্তাহীন হইয়া পড়িয়াছেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বাংলাদেশে গত কয়েক মাস ধরিয়া অস্বাভাবিক ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অস্থিরতাই ইহার মূল কারণ। ফলে সহিংসতা ও নৃশংসতা নূতন মাত্রা লাভ করিয়াছে। রাজনৈতিক ময়দান ও রাজপথ অস্থিতিশীল তো বটে, এমনকি নাগরিক সমাজেও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়াছে। প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন লোমহর্ষক খুন-খারাবির খবর পাওয়া যাইতেছে। যাহারা দাগি খুনি ও সন্ত্রাসী তাহারাও এই দুঃসময়ের সুযোগ গ্রহণ করিতেছে। পুলিশ রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলির নিরাপত্তা প্রদানে অধিক তত্পর বিধায় চোর-ডাকাত ধরিবার সময় নাই। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হইতেছে। আবার শহর ও নগরের দিকে বেশি করিয়া মনোযোগ দিতে গিয়া গ্রামাঞ্চল অরক্ষিত হইয়া পড়িয়াছে। হরতালসহ যে কোন দিনে জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে অস্থিরতা দেখা যাইতেছে সবচাইতে বেশি। শুধু তাহাই নহে, গত কয়েক মাসে সারা দেশে দেড় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটিয়াছে যাহা এক কথায় অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। ইহার মধ্যে পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যাই সর্বাধিক। এমতাবস্থায় পুলিশের উপর হামলা বন্ধের কোন লক্ষণ নাই বলিলেই চলে। কোন রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন বিরোধী দল দমনে এই পুলিশকেই ব্যবহার করিয়া থাকে। প্রশাসনের ক্ষমতার উপর ভর করিয়া নিজেদেরকে বিরাট ক্ষমতাবান মনে করেন অনেকে। কিন্তু যেই ক্ষমতার আশীর্বাদ সরিয়া যায়, অমনি তাহারা আবার পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন। বিরোধী দল করিয়াছেন অথচ পুলিশের লাঠিপেটা খান নাই এমন রাজনৈতিক নেতা খুব কমই আছেন। কর্মীদের কথা না হয় বাদই দেওয়া হইল। যুগ যুগ ধরিয়া এই সংস্কৃতিই চলিয়া আসিতেছে এই দেশে। কিন্তু ইহা হইতে কেহ শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই ও করিতেছেন না। এখন একটি ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল নির্মূলের প্রশ্ন আসিতেই সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশের উপর হামলা বাড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু যাহারা নিজেদের ও দলীয় স্বার্থে পুলিশকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলিয়া দিয়াছেন, তাহারা তাহাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তার চিন্তা কি করিয়াছেন? যেই পুলিশের কব্জি উড়িয়া গিয়াছে তিনি একজন শিক্ষানবিশ উপ-পরিদর্শক। তাঁহাকে কেন কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হইল তাহার কি কোন জবাব আছে? যেই গাড়িতে করিয়া জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে টহল দল কাজ করিতেছিল, সেই গাড়িটি ছিল রিকুইজিশন করা। ফলে ড্রাইভার সুযোগ বুঝিয়া কাটিয়া পড়ে। ইহাছাড়া সহকর্মীদের অধিকাংশই ছিল নূতন নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তাহারাও একই কাজ করে। পুলিশ নিয়োগে যে হারে দুর্নীতি হয়, তাহাতে নবীন পুলিশের দায়িত্বজ্ঞান নিয়া প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। আমাদের প্রশ্ন হইল, স্বাধীনতার চার দশক পার হইলেও আর কতদিনে পুলিশ অস্ত্র-শস্ত্র, জনবল ও মনোবলে স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী হইবে? র্যাব ও বিজিবিকে কেন খোলা গাড়িতে টহল দিতে দেখা যায়? ইহা কি তাহাদের জন্য বিপজ্জনক নয়? এই উপমহাদেশ ছাড়া আর কোথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ এতটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। পুলিশের উপর অমানবিক হামলায় আমরা যাহার পর নাই দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন। কিন্তু যাহারা পুলিশকে ব্যবহার করিয়া স্বার্থপরের মত নিজেদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করিবার কথা ভাবেন, তাহাদের কখন বোধোদয় হইবে তাহাই বড় প্রশ্ন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন