[ রা জ নী তি ]

কোন্ পথে যাচ্ছে স্বদেশ?

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৭
আমাদের রাষ্ট্র ক্ষমতার পালাবদলের যান্ত্রিকতা সকলের কাছেই স্পষ্ট। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন তা আবর্তিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে। জাতীয় পার্টি রঙ্গমঞ্চে একটি সময় অবস্থান করলেও এরশাদ বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানের মত দল গুছাতে পারেননি। অন্যদিকে জামায়াতের বাস্তবতা ভিন্ন। এ দল স্বর্ণলতার মত। এ ডাল ও ডাল ধরে বেঁচে থাকলেও একক ক্ষমতায় সরকার গঠন করার মত জনমত এদের পক্ষে তৈরি হয়নি। অন্যদিকে দেশের বৃহত্ দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বের চিন্তায় ও কাজে গণতান্ত্রিক আচরণ নির্বাসিত থাকায় নির্বাচনী যুদ্ধে জনসমর্থন লাভের ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী থাকেন না। গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে তারা নিজ নিজ পক্ষে জনমত গঠনে নগর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েন না। শুধু সরকার গঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য সেরাতুল মুস্তাকিম খুঁজতে থাকেন। এ কারণে নানা শক্তি-অপশক্তির সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করায় অধিক মনোযোগী হন। এভাবে স্বৈরাচার বলে ধিকৃত এরশাদ কারো আশ্রয়ে সদম্ভে দাঁড়ান আবার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধীদের নেতৃত্বে বেড়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী কারো বন্ধু হয়। তারপরও প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতির কারণে ক্ষমতা প্রত্যাশী দলের নেতারা প্রতিপক্ষকে চরম অবিশ্বাস করে ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য অন্ধকার পথ খুঁজতে থাকেন। আর এসব ভয়ঙ্কর ক্ষমতা বিলাসী নিজ মোক্ষ লাভের পথ পরিষ্কার করার জন্য জনগণের সুখ, সম্পদ ও জীবন বিপন্ন করে দিয়ে চরম অরাজকতায় ডুবিয়ে ফেলেন দেশকে। কখনো কখনো এতটা ঘোলাটে করে ফেলেন যে, বোঝা যায় না শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে দেশ। এখন অমন এক মর্মান্তিক অবস্থার মুখোমুখি স্বদেশ। দেশ জুড়ে সাধারণ জনগণের ওপর নিজ নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের খোঁজ না নিয়েই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতা কাড়াকাড়ির এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিজ ক্ষমতা ও কৌশলে সংবিধান সংশোধন ও আইনি সুবিধা কব্জা করে নেয়। ফলে এতে নানা অশুভ সংকেত দেখতে থাকে বিএনপি। একারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে আসার দাবিতে নানা আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠ গরম করতে থাকে। কিন্তু মুশকিল হল দলটি বিএনপি। দু’দিন আগে দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর নানা অপশাসনের অভিযোগে সাধারণ মানুষ ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। তাই নানা কসরতেও আন্দোলন জমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর মনোবল ফিরে পায় বন্ধু জঙ্গিবাদী জামায়েতের আশ্বাসে। জনবল আর পেশীশক্তির যোগান দেয়ার আশ্বাসে বিএনপিকে মাঠে নামায়। জামায়াতের বিধ্বংসী সকল কর্মকাণ্ডে বিনাপ্রশ্নে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়। একারণে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশ ও জনগণের সম্পদ ও জীবনহানি ঘটিয়ে, হরতালে হরতালে জনজীবন বিপর্যস্ত করে সরকারকে প্রচণ্ড চাপে ফেলবে। জামায়াতের কাছে টিক্কাখানের শিক্ষা রয়েছে। সেই শিক্ষায় বিএনপিও যেন প্রশিক্ষিত হতে চাইছে। তাই তারাও যেন চাইছে পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করতে। সাধারণ মানুষ আর দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হোক তাদের তাতে কিছু যায়-আসে না। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার প্রস্তুত রাখতে পারলেই নিশ্চিন্ত। কারণ বেগম জিয়ার উত্তরাধিকার তো প্রস্তুত হয়েই আছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রথম হিসেব মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত নিজ নেতাদের মুক্ত করা। একারণে বিএনপির পূর্ণ সমর্থন তাদের চাই। এ লক্ষ্যে তারা সফলও। তাই হরতালের নামে সাধারণ মানুষ আর সরকারের গাড়ি-ঘোড়া জ্বলছে। মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের প্রতিমা ভাঙ্গা হছে। আগুন লাগানো হচ্ছে বসত বাড়িতে। প্রকাশ্যে বোমা মেরে পুলিশের হাতের কব্জি উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ইট আর হেলমেট দিয়ে পুলিশ অফিসারের মাথা আর মুখ থেঁতলে দেয়া হচ্ছে। আগুন দেয়া হচ্ছে পুলিশ ফাঁড়িতে। আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বিদ্যুত্ কেন্দ্র। অথচ গণতান্ত্রিক দল বলে দাবিদার বিএনপির নেতারা এসব অনাচার সম্পর্কে দায়িত্বশীল কথা না বলে ব্লেমগেমেই ব্যস্ত। পুলিশের গুলিতে মানুষ হত্যাটিই একমাত্র বক্তব্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশবাসীর জীবন ও রক্তমূল্যে বেগম জিয়া যদি সিংহাসন পেয়েই যান তবে তার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তা ভেবে দেখেছেন? একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি আর সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে তাকে রাজদণ্ড হাতে নিতে হবে। এসময় পরিকল্পনা মাফিক জামায়াত নেতারা মূর্তিমান যমদূতের মত দাঁড়াবেন। বলবেন চার বছর চেষ্টা করেও আন্দোলন শানাতে পারেননি। আমাদের ঘাড়ে ভর দিয়ে সিংহাসনে বসেছেন। রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থায় আমাদের অংশগ্রহণের এই এই দাবি মানতে হবে। তখন বিএনপি নেতৃত্ব যে সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াবে তাকে সামাল দেয়া কি সহজ হবে? বিপুল ভোটের মালিক হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে নিশ্চিন্তে শীতঘুম দিয়ে ফেলেছিল যেন। গণতন্ত্র চর্চার অভাবে বুঝতে পারেনি রাষ্ট্রক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ফলে সুশাসন স্থাপনের ব্যাপারে কোনো মনোযোগ দেয়নি। ছাত্রলীগের চাঁদাবাণিজ্য, দখলদারিত্ব এবং সন্ত্রাস সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল সরকার গঠনের পর থেকেই। এর প্রতিবিধান না করে আওয়ামী লীগ কেবল শাক দিয়ে মাছ ঢেকেছে। প্রশাসনিক দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়েছে। তারপরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ধরনের কয়েকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে পদক্ষেপ নিয়ে সলতেতে কিছুটা আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী দলটি দেশকল্যাণে কোনো দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। জঙ্গিবাদ দমনের কৃতিত্ব গাঁথা বার বার প্রচার করেছে, কিন্তু সারা দেশের গর্তে যে সাপ বড় হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো ভ্রূক্ষেপ করেনি। জামায়াতী তত্পরতা সারা দেশে ছড়িয়েছে। ধর্মের ধুয়ো তুলে সাধারণ মানুষকে ধর্মান্ধ বানাচ্ছে জামায়াতের শিবির ক্যাডাররা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অমেধাবী ছাত্রলীগ ক্যাডাররা দখলদারিত্ব আর মারামারিতে ব্যস্ত থাকছে। সাধারণ মানুষের চোখের সামনে থেকে ধর্মান্ধতার পর্দা সরিয়ে তাদের যুক্তিবাদী ধার্মিক বানানোর চেষ্টা করেনি। তাই সরকার পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগ অবাক বিস্ময়ে এবং বিচলিত হয়ে দেখছে জামায়াত শিবিরের প্ররোচনায় বগুড়া, কানসাট সর্বত্র মানুষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রকৃত সত্য না জেনেই ইসলাম বিপন্নের মত গুজবে বিশ্বাসী হয়ে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করছে। এসবের সামনে অসহায় দাঁড়াতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। আর এসব কপট চলচ্চিত্রের প্রযোজক পরিচালক বিএনপি। জামায়াতে পেছনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। এমন অনাচারের সময়কালে আরেক দল আলেম ওলামা সোচ্চার ভূমিকায় নেমেছেন। অধিকাংশ মুসলমানের দেশে ইসলাম বিপন্ন হলে তার হেফাজতের দায়িত্ব নিশ্চয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ওপর বর্তাবে। এদেশের কোটি কোটি মুসলমান নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত আজান আর নামাজ হচ্ছে। দেশ জুড়ে বরাবরের মত ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় জলসা হচ্ছে। যখন জামায়াতে ইসলামী দলের মানবতাবিরোধী অপরাধী নেতাদের বিচার শুরু হলো, এক পর্যায়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তরুণ প্রজন্ম গণজাগরণ মঞ্চ করলো, দ্রুত সারা দেশ ও দেশের বাইরের অগণিত বাঙালি প্রজন্মের আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করলো তখনই প্রমাদ গুণলো জামায়াত। আর জামায়াতের নির্দেশে প্রমাদ গুণতে লাগলো বিএনপি। এসময়ই প্রজন্মের আন্দোলনের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির জন্য আন্দোলনকারী ব্লগারদের কারো কারো ব্লগে মহানবী (স.) ও মহান আল্লাহর প্রতি কটূক্তি করার ব্যাপারে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। মহানবী (স.) ও আল্লাহকে অসম্মান করে কোন বক্তব্য কেউ দিলে অবশ্যই তার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। এসব দুর্বৃত্তের শাস্তির দাবি করা অন্যায় নয়। এও মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, ব্লগ একটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। এটি সর্বত্র প্রচারিত নয়। ব্লগাররা এখানে ব্যক্তিগত ভাব বিনিময় করে থাকে। যদি ইসলাম অপমানকারী কোন কথা লেখাও থাকে সঙ্গত কারণেই এতদিন তা কারো নজরে আসেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে যারা তত্পর তাদের এক পত্রিকা এই প্রায় গোপন বা সীমাবদ্ধ জায়গায় প্রচারিত বিষয় সবার সামনে ছড়িয়ে দিল। যদি জনমনে ক্ষতির কিছু হয়ে থাকে তা সবচেয়ে বেশি হলো এই পত্রিকা প্রচারণায়। মহানবী (স.) ফ্যাতনা ফ্যাসাদ থেকে মুসলমানদের দূরে থাকতে বলেছেন। ব্লগারদের শাস্তির দাবির পাশাপাশি দ্বন্দ্ব ছড়ানোর জন্য দায়ী পত্রিকা পরিচালকদের ব্যাপারে কি কিছু বলা উচিত নয়? খুব কাম্য ছিল হরতালের নামে গাড়ি পোড়ানো, মানুষের সম্পদ ও জীবনের ওপর আক্রমণ, সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা গেছে বলে মানুষকে উস্কে দিয়ে অরাজকতা তৈরির প্রতিবাদ। প্রকাশ্যে পুলিশের হাত উড়িয়ে দেয়া, মাথা থেঁতলে দেয়া এসব ইসলামের দৃষ্টিতে কী অন্যায় নয়? ক্ষমতা দখল আর আঁকড়ে রাখার মহড়ায় চতুর্মুখী অনাচার চলছে। কে-কাকে চালাচ্ছে তা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। আমার ধারণা আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলো যার যার জায়গা থেকে চরম বাড়াবাড়ি করেছে। আর ব্যবহার করছে নানা ঘরানা ও গোষ্ঠীর মানুষকে। এখন কোন পক্ষই জাল গুটাতে না পেরে অসহায় অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে অনেকের দৃষ্টি যাচ্ছে সেনানিবাসের দিকে। অন্তত জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্যদিয়ে শেষ রক্ষা করা যায় কিনা! এমনিতেই বিপন্ন দশা গণতন্ত্রের। এর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার অপেক্ষা করছে যেন স্বার্থবাদী রাজনীতি। লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন