জননেতা আব্দুল মান্নান মানে স্বাধীন বাংলা বেতার। জননেতা আব্দুল মান্নান মানে সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’। জননেতা আব্দুল মান্নান ছিলেন মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এম.এন.এ। ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। যুদ্ধকালীন তাঁর ছদ্মনাম ছিল আহমেদ রফিক। যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য। টাঙ্গাইল থেকে ১৯৭০, ৭৩ ও ৯৬ সনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় আমবাগানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ প্রশাসনিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছিলেন জননেতা আব্দুল মান্নান। তার কয়েকদিন পরই তাঁকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্থাত্ এম.এন. এ ইনচার্জ করে তথ্য ও চলচ্চিত্র দফতর করা হয়। যা ছিল তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত মন্ত্রীর পদমর্যাদা। যেকোন মুক্তি সংগ্রামের রণাঙ্গন বাদে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা হলো Psychological War বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মূল লক্ষ্য, প্রচার অভিযান প্রবল ও ক্ষুরধার করে শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দেয়া এবং সংগ্রামী জনগণকে সংঘবদ্ধ করে স্থানীয় পর্যায়েও যুদ্ধকে জোরদার করা। একইসঙ্গে মুক্তিফৌজের সহযোগী হিসাবে তাদের সঙ্গে থেকে জয়ের বারতা জনগণকে পরিবেশন করা। এই কাজগুলোর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসাবে ছিলেন আব্দুল মান্নান।
মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার দায়িত্বও ছিল তাঁর ওপর। কলকাতার বালু হাককাক লেনে ছিল পত্রিকার অফিস। একইসাথে অফিসটি ছিল কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের যোগাযোগ কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রশাসন চলতো সেই অফিস থেকেই আব্দুল মান্নানের মাধ্যমে। সেই বাড়িতেই আব্দুল মান্নানের পরিবারের সঙ্গে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও তাঁর পরিবার নিয়ে থাকতেন।
দুর্মর আত্মশক্তির জোরে চলার পথ তিনি নিজেই বিনির্মাণ করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর অনুবর্তী হিসাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকের প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। ছয় দফা আন্দোলন, ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী আন্দোলনসহ সব আন্দোলনেই তিনি রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের দিনগুলোতে তিনি দলের সংহতি রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ দক্ষ সংগঠক হিসাবে কাজ করে গেছেন।
ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর কারাগার জীবনের সময় আব্দুল মান্নানের বাসা ছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমেনা বেগমসহ অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্বের আশ্রয়স্থল এবং আন্দোলনে সংগ্রামে একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধকালীন আব্দুল মান্নানের ভূমিকা তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু তাকে প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে কালোবাজারী প্রতিরোধে পুলিশি অভিযানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন একজন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর কর্মপরিধি কতটুকু হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার মান ও মাত্রা তিনিই প্রথম প্রণয়ন ও নির্ণয় করে গেছেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিসেবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন রূপরেখা তাঁর হাতেই প্রণীত। পরিবার পরিকল্পনাকে তৃণমূল স্তরে কার্যকর ও বাস্তবায়নের জন্য তিনিই প্রথম টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর বড় সাফল্য ছিল বাংলাদেশ থেকে তখনকার মতো ম্যালেরিয়া রোগের মূল উত্পাটন। টাঙ্গাইলবাসীর জন্য ‘টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল’ ছিলো জননেতা আব্দুল মান্নানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
পরিণত বয়সের মৃত্যুতে কষ্ট থাকে, আক্ষেপ থাকে না। কিন্তু জননেতা আব্দুল মান্নানের মৃত্যুতে কষ্টের সঙ্গে আক্ষেপও হচ্ছে প্রচণ্ড। কেন এই আক্ষেপ? তিনি তো মারা গেছেন বার্ধক্যজনিত রোগ-শোক-জরায়। জাতিকে তিনি দিয়েছেন প্রচুর। অথচ অসুস্থ অবস্থায় জাতি তাঁকে কিছুই দেয়নি। বেশ কিছুদিন তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। তেমন কেউ তাঁর পরিবারের খোঁজ-খবরও নেয়নি। তবে কি এই সমাজ পুরোটাই রাজনৈতিক স্বার্থপরতায় ভরে গেছে, মানবিকতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই সমাজে? যখন শক্তি ছিলো, উদ্যম ছিলো, প্রাণচাঞ্চল্য ছিলো, তখন তার কাছ থেকে নেয়ার প্রশ্ন ছিল। আর যখন তিনি শক্তিহীন, নিথর, অবচেতন, তখন তাকে কিছু দেয়ার নেই! সব কথা বলা যাচ্ছে না, এসব কথা বলা যায়ও না। কিন্তু রাজনীতি করে যারা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, রোগাক্রান্ত আব্দুল মান্নানের ব্যাপারে তাদের অনেকের নিস্পৃহতা খুব কষ্ট দিয়েছে। কী অপরাধ ছিলো তাঁর? রাজনীতিকে সেবাধর্ম মনে করেছিলেন তিনি, সেবাপণ্য নয়। দুর্নীতি করে শেষ জীবনে চিকিত্সার জন্য টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখতে পারেননি, এই তাঁর অপরাধ?
যৌবন, মধ্যবয়স, এমনকি বৃদ্ধ বয়সেও দেশ ও জাতির নিরবচ্ছিন্ন সেবা করে ২০০৫ সালের ৪ এপ্রিল জননেতা আব্দুল মান্নান প্রায় নীরবে-নিভৃতে চলে গেছেন আমাদের কাছ থেকে। এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার যে ভূমিকা, সে অনুযায়ী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অবচেতন অবস্থাতেও যথোপযুক্ত প্রতিদান পাননি। এই খেসারত দিতে হবে সত্ ঐতিহাসিকদের। এ দেশের ইতিহাস রচনার সময় তাঁর প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপনা না করলে সেই ইতিহাসের কোনো ঐতিহাসিক বাজারমূল্য থাকবে না।
লেখক :নিবন্ধকার আব্দুল মান্নানের পুত্র
