আমরা এখন স্বাধীন। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন। দাপটের মর্যাদাকে যদি স্বাধীনতা বলে মানতে হয়- তাহলে সেই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। পাইনি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক মুক্তি। স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”। কিন্তু সে মুক্তি কোথায়? স্বাধীনতা আর মুক্তি এক কথা নয়। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু স্বাধীন দেশের কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি সুদূর পরাহত। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তা এখনও কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবায়নের গতি ধীর। তার একমাত্র কারণ সুস্থধারার রাজনীতির পরিবর্তে দেশ অপরাজনীতিতে মগ্ন। নীতি-নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক দলে পরিপূর্ণ আমাদের দেশ। বড় বড় রাজনৈতিক দলের মুখে শোনা যায়- তারা দেশের কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। সকলেই দেশের কল্যাণ চায়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ অর্জিত হচ্ছে না কেন? তার কারণ রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার অভাব, স্বার্থহীনতার অভাব, সততার অভাব, দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসার অভাব। রাজনীতিবিদের মধ্যে অনেকেই মুখে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন- কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার বিপরীত। দেশের রাজনীতিতে শালীনতা বলতে কিছু নেই। আছে একদল অপর দলের বিরুদ্ধে অহেতুক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। অনেক রাজনীতিবিদদের মধ্যে শুধু চলছে ক্ষমতার লড়াই, প্রতিহিংসা, বর্বরতা, দুর্নীতি, লুট, অর্থ পাচার এবং যে যার মতো শোষণের রাজনীতি। গুটিকতক সত্ চিন্তার রাজনীতিবিদ থাকলেও দলকে সমর্থন দিতে গিয়ে তাদের সেই সত্ চিন্তা লোপ পেয়ে যায়। প্রায় সময় আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা সংসদে, রাজপথে দাঁড়িয়ে দেশ ও জাতির কথা তেমন না বলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে একদল অন্য দলকে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে অকথ্য ভাষায় কটুক্তি করতে থাকে ও বদনাম রটাতে ব্যস্ত থাকে। আমাদের দেশের বড় দুই দলের রাজনীতির মূলনীতি হলো স্বজনপ্রীতি। আমাদের দেশে দলতন্ত্র, গোষ্ঠিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান। তুলনামূলকভাবে জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণের চেয়ে নিজের গোষ্ঠী, আত্মীয়-স্বজনদের কল্যাণ ও স্বার্থ অধিক প্রাধান্য পায় তাদের রাজনীতিতে। তাদের কৃতকর্মের ফলে দেশের অগণিত জনসাধারণ নিপীড়িত, নিষ্পেষিত এবং ফুটপাথ ও রাস্তার বাসিন্দা।
আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। স্বাধীনতা কি, কতটুকু স্বাধীনতা এটা বোঝার বিষয়। কোন এক সময়ে টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে আমার থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল- বাংলাদেশ স্বাধীন করে আমাদের অর্জন কি? বলেছিলাম, অর্জনতো অবশ্যই হয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, এটাইতো একটা বড় অর্জন। তবে স্বাধীনতার মর্ম স্পর্শ করে কাঙ্ক্ষিত অর্জন কতটুকু হয়েছে- তা বিশ্লেষণের ব্যাপার। কিছু উন্নতি অবশ্য লক্ষণীয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাটের উন্নতি হয়েছে, যা অর্থনীতির উন্নতির সাথে জড়িত। খাদ্যে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন-ও লক্ষণীয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসাটাও অর্জন- তবে জাতীয় সংসদকে সকল কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। যে কোন দল বিরোধী দলে গেলেই নানা অজুহাতে সংসদ বর্জন করার মত অগণতান্ত্রিক কাজে লিপ্ত হন। এটা সকল দলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর সাংসদবৃন্দ জনগণকে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলেন। যা হোক, কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলেও তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিসিঞ্জারের মন্তব্য “তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ” অবশ্য কিছু হলেও উত্তরণ হয়েছে। তবে এটা কাঙ্ক্ষিত ও যথেষ্ট নয়। মালয়েশিয়া, কোরিয়া আমাদের পরে স্বাধীনতা অর্জন করে অচিন্তনীয়ভাবে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছে। আমরা কেন পারি না। আমাদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে এবং উন্নতির বাস্তবমুখী কর্মপন্থা গ্রহণ করে নিঃস্বার্থভাবে তা সামনে এগিয়ে নিতে হবে। অপরাজনীতি বর্জন করে শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা করতে হবে। দেশের বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের দেশপ্রেম কতটুকু। আমাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনার ভিতরে ঢোকাতে হবে আমরা দেশকে কতটুকু ভালবাসি। দেশের উন্নতির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সামাজিক দায়বোধ নৈতিকতাবোধ থাকতে হবে। সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। সকলের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি করতে হবে। তবেই দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব এবং দেশের অগণিত অন্নহীন, বস্ত্রহীন, হতদরিদ্র, অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যাবে। তবেই দেশের উন্নতি, আমাদের সাফল্য।
লেখক : ভাষাসৈনিক
