গত ১৬ মার্চ মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে অনুষ্ঠিত জনসভায় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সাথে কোনো আলোচনা নয়। এখন এক দফার সরকার পতনের আন্দোলন হবে। হয় সরকারের বিদায় না হয় হরতাল ঘেরাও অবরোধ’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ মার্চ)। খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের জবাবে পরদিন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, সংলাপের মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব; কিন্তু খালেদা জিয়া সংলাপের পথ পরিহার করে সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছেন। তার সংলাপ নাকচ করার মতো ‘অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।’ সংঘাতের পথ পরিহার করে বিরোধী দলকে সংলাপে আসার আহবান জানিয়ে হানিফ বলেন, সরকার সংলাপের জন্য প্রস্তত রয়েছে। যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় সংলাপ হতে কোনো অসুবিধা নেই। আশার কথা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি (২৭ মার্চ) সংলাপের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, বিএনপি বরাবরই আলোচনার কথা বলছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপের বিল পেশের সময় বিএনপি সরকারকে ‘এই ভয়াবহ পথ থেকে সরে এসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের’ আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু, সরকার কর্ণপাত করেনি। এখন যদি সংলাপের উদ্যোগ নিতে হয় তাহলে তা সরকারকে নিতে হবে। উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব বিরোধী দলের নয়, এটা সবসময় সরকারের দায়িত্ব।
সরকারের পক্ষ হতে এ ধরনের আলোচনার প্রস্তাব ও শর্তসাপেক্ষে সে প্রস্তাবে বিরোধী দলের সম্মতি নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ওই দিন রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলোচনার বিকল্প নেই। নির্বাচনসহ যেকোনো বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে আওয়ামী লীগ সব সময় প্রস্তুত। তিনি আরো বলেছিলেন, আজ হোক কাল হোক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা সমাধান করতে হবে। আলোচনা ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার প্রস্তাবের জবাবে বিএনপি নেতৃবৃন্দ শর্তসাপেক্ষে আলোচনায় বসতে সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। শর্তাদি ছিলো, ‘বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চাইলে প্রধানমন্ত্রীকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে হবে। সেই সঙ্গে বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, মামলা, হামলা ও মানুষ হত্যা বন্ধ করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’ এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে। তাদের কাছ থেকে সাড়া পেলে শিগগির আলোচনা শুরু হবে। আলোচনার পর আগামী সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। তার এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপি নির্দলীয় সরকার ফর্মুলার ভিত্তিতে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো। কিন্তু আজ পর্যন্ত এগুলোর কোন বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
এ যাবত্ সংলাপ অনুষ্ঠিত না হওয়ার কারণ, বিএনপি তার মূল দাবি সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা হতে সরে আসেনি এবং সরকার নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি পুনর্বহালের সম্ভাবনা বারবার নাকচ করে দিয়ে আসছে। তাছাড়া, বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য সরকার সাম্প্রতিককালে আর এটি শর্তের উল্লেখ করেছে। সেটি হলো, বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে।
একদিকে শর্তের বেড়াজাল এবং অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে পুলিশের হামলা, বিরোধী জোটের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও কারাগারে আটক, বিরোধী জোটের হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে পুলিশের গুলিতে শতাধিক প্রাণহানি সরকার ও বিরোধী দলের সংলাপের পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরতাল, অবরোধ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের, বিশেষ করে বিরোধী জোটের সহযোগী দল জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং পুলিশের গুলিতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানিতে সাধারণ মানুষ হতভম্ব ও শংকিত। দেশের সুশীল সমাজ, মিডিয়া এবং যুবসমাজসহ সাধারণ মানুষ সরকার ও বিরোধী দলকে বারবার অনুরোধ জানাচ্ছে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের জন্য। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার লড়াইয়ে বহুকষ্টে অর্জিত গণতন্ত্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশ আবার অগণতান্ত্রিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
শুধু সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ নয়, আমাদের বিদেশি সুহূদরাও বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে চলমান সহিংসতায় প্রাণহানিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযত আচরণের আহ্বান জানিয়েছে ওআইসি। চলমান হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতকরাও।
ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ওপরে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দিয়ে শর্তের বেড়াজাল ডিঙিয়ে সরকার ও বিরোধী দলকে কোনো শর্ত ছাড়াই আলোচনায় বসতে হবে। আলোচনার টেবিলে এসেই আলোচনার এজেণ্ডা নির্ধারণ করে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে হবে। যেহেতু চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য মূলত সরকার দায়ী, সেহেতু সরকার ও সরকারি দল আওয়ামী লীগকে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, সৃষ্টি করতে হবে আলোচনার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ। বিরোধী দলকে সংসদে ফিরিয়ে আনতে পারলে আলোচনার পথ যে সুগম হতো এটা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। কিন্তু বিরোধী দলকে সংসদে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সরকার। এই ব্যাপারে সরকারের মনোভাব নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, বিরোধী দলের সংসদ অধিবেশনে যোগদান ও সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সরকার তেমন আগ্রহী নয়। সংসদে ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ সরকারের বেশি পছন্দ। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিগত বিএনপি সরকারও বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সংসদ অধিবেশনে যোগদানের ব্যাপারে অনুরূপ মনোভাব পোষণ করতো।
আলোচনা অনুষ্ঠান ও ফলপ্রসূ করতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভূমিকাও কোনোভাবে কম নয়। তাদেরকে খোলা মন নিয়ে আলোচনায় আসতে হবে। তার আগে বিএনপি শুধু নিজেরাই শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল ও অন্য কোনো কর্মসূচি পালন করবে না, বিরোধী জোটের সহযোগী দল জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির যেন শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে তা নিশ্চিত করবে।
কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা না হলে ঘটনা দুদিকে মোড় নিতে পারে। এক. ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। দুই. পুরোপরি সামরিক শাসন আসতে পারে। যেটিই ঘটুক তাতে গণতন্ত্রের গতি বাধাপ্রাপ্ত হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি এই দুটি দলের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।
সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, গণতন্ত্র রক্ষার্থে এবং নিজেদের স্বার্থে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপিকে তাদের নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। বহুল প্রচলিত ‘গিভ এন্ড টেক’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসলে সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। তাই, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলোচনা হতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক :সাবেক সচিব
