প্রথা ভেঙে যিনি নির্মাণ করেন নিজের পথ

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৭
লায়লা সামাদ একজন প্রথাভাঙা মানুষ। বৈরী সমাজের সব প্রতিকূলতা ভেঙে তিনি নিজে শিক্ষিত, রাজনীতি ও সমাজ সচেতন হয়েছেন তেমনি তাঁর চারপাশের মানুষকেও এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে বীজ বুনতে চেয়েছেন নৈতিকতা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধের। মনে পড়ে তাঁর মগবাজারের একতলা বাড়ির নিখুঁতভাবে সাজানো একটি ড্রয়িংরুম। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচি ও আভিজাত্যে যার পরতে পরতে জড়ানো সাদা থান শাড়ি, হাতাকাটা ব্লাউজ, কপালে বড় টিপ, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার সঙ্গে মায়া জড়ানো হাসির অপূর্বচ্ছটা। স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও অতি আধুনিক রুচিসম্পন্ন এই মানুষটিই কথাবার্তা, আচার-আচরণে ছিলেন একেবারেই শিশুর মতো সহজ ও সরল। গত শতকের পঞ্চাশ দশকে লায়লা সামাদ শুধু সাহিত্য ও সাংবাদিকতা নয়-রাজনীতি, সমাজকল্যাণ, মঞ্চনাটক, প্রচ্ছদশিল্প, মডেলিং, বিনোদন পত্রিকা প্রকাশসহ বহু সৃজনশীল কাজের অগ্রভাগে ছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি যে পুরোধা ব্যক্তিত্ব তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিংবদন্তীসম এই মানুষটি জগদ্দল পাথর সরিয়ে যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেই পথ ধরেই আমরা এখনো এগিয়ে চলছি। অত্যন্ত মেধাবী লায়লা সামাদের লেখা অল্প বয়সেই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। স্কুল জীবন থেকেই লায়লা সামাদ ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন। দিনাজপুরে বিখ্যাত নাজিমউদ্দিন হলে কয়েকটি সভায় বাবার সঙ্গে তিনিও বক্তব্য রেখেছিলেন। সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করেন, লায়লা সামাদ সেই প্রতিভাধরদের একজন, যারা তাদের সময়ের আগেই জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Ahead of times। গ্রহণ, ধারণ ও স্বীকার করার মতো সমাজ সৃষ্টি হওয়ার আগেই তাঁর জন্ম হয়েছিলো। যে অভিজাত বনেদি পরিবারে তাঁর জন্ম, সে সমাজ তাঁকে শেকল পরাতে পারেনি। বিয়ে করেছিলেন সেই অন্ধকার সময়ের এক আলোকিত মানুষ, নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট নেতা মির্জা আব্দুস সামাদকে। রাজনৈতিক কারণে তখন মির্জা সামাদকে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় থাকতে হতো। ১৯৫৭ সালে লায়লা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। সেই পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন এবং বংশীধর জার্নাল স্বর্ণপদক লাভ করেন। তিনিই প্রথম মুসলমান নারী যিনি এই পদক পেলেন। ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সরোজিনী নাইডুর হাত থেকে তিনি এই পদক আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। পদকপ্রাপ্তির এই খবর তখন আনন্দবাজার ও স্টেটসম্যান পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয়। কলকাতা থেকে পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় এসে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। বেগম, পূর্বদেশ, সংবাদ, চিত্রালী ইত্যাদি পত্রিকায় কাজ করার পর তিনি ১৯৭০ সালে চিত্রিতা নামের এক অসামান্য সুস্থ বিনোদন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হয়েছিলেন। তাঁর নিজের প্রেস কথাকলি থেকে এই পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন: এভাবে অনুভব এবং অনুধাবন মানুষের অন্তরলোকে যে আনন্দের সুপ্রাচীন সমুদ্রকে অহরহ উদ্বেলিত করে আমাদের লক্ষ্য সেই সুস্থ নির্মল এবং প্রাণবন্ত আনন্দকে সবার জন্য পরিবেশন করা। তাই বাংলাদেশে যারা সুস্থভাবে সংগ্রাম করেন-তারা সবাই আমাদের এই আনন্দলোক আবিষ্কারের অভিযাত্রায় সহযাত্রী। ১৯৫২ সালে লায়লা সামাদ দৈনিক সংবাদে চিফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেছেন। তিনিই আমাদের দেশের প্রথম নারী রিপোর্টার। তাঁর সময়ে যা ছিলো অকল্পনীয়। তাঁর মেধা ও সাহসের কাছে সেই দাম্ভিক সময় পর্যুদস্ত হয়েছিলো। তিনি ১৯৫০-এ বেগম পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসাবে সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। ছোটগল্প লেখায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী, লেখিকা সংঘ পুরস্কার, নূরুন্নেসা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী ও হাসান হাফিজুর রহমান স্বর্ণপদক এবং সুফী মোতাহার হোসেন পদক পেয়েছিলেন। ইস্কাটন লেডিজ ক্লাব নারী সাহিত্যিকদের পুরস্কৃত করার জন্য লায়লা সামাদ সাহিত্য পুরস্কারের প্রবর্তন করেছে। বিজনেস অ্যান্ড প্রফেশনাল উইমেন্স ক্লাব, বেগম ক্লাব, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে যুক্ত থেকে বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। সংস্কৃতি জগতে সমস্ত বাধার বিরুদ্ধে ছিলো তাঁর নিরন্তর সংগ্রাম। সবচাইতে বড় কথা, সবধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে অন্য নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজকের সংস্কৃতি নারী কর্মীদের সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিতেই হবে। তাঁর প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া দরকার। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের পুনঃপ্রকাশ, বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থা এবং তাঁর কর্মকাণ্ডকে বাঁচিয়ে রাখতে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, গবেষণা করার উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন। নারী ও সাহিত্য সংগঠনগুলো তাদের এই অগ্রদূতকে ভুলে গেলে, যথাযথ মর্যাদা না দিলে, সেই ব্যর্থতার দায়ভার তাদেরই বহন করতে হবে। লায়লা সামাদের চরিত্রের মধ্যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার যে উদাহরণ আছে, টানাপড়েনের অজস্র অভিজ্ঞতার মধ্যে স্তব্ধ সমাজকে ভেঙে-গুঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা আছে, তাকে আমাদের উপলব্ধির মধ্যে রাখতে হবে। তাঁর লেখা পড়ে মনে হয়েছে, মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন সে জিনিয়াস, নির্ভীক এবং শুদ্ধ। তিনি বলেছেন, স্বপ্ন যা কদাচিত্ বাস্তব হয়ে ওঠে, তা-ই মানুষের পবিত্র ভালোবাসার ফসল। এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে ভেতরের মানুষটিও দেখা যায়। একটা স্বপ্নের সঙ্গে আরেকটা স্বপ্নের যোগসূত্র খুঁজে নেয়া যায়। তাই আমরা যারা লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যু্্ক্ত, তারা সেখান থেকে প্রেরণা ও শক্তি পাই। গত ৩ এপ্রিল ছিল তাঁর জন্মদিন। গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে আমরা স্মরণ করছি। লেখক :সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন