অর্থনীতি

ব্যয় সংকোচনের অর্থনীতি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৮
প্রায় ২ দশক ধরে পৃথিবী জুড়ে চলছে ব্যয় সংকোচন নীতির প্রসার। উন্নয়নশীল এবং অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগা দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক এবং তাদের সহযোগী আইএমএফসহ বিভিন্ন লগ্নী ও দাতা সংস্থাগুলো পরামর্শ দিলো সরকারি ব্যয় সংকোচনের। সরকারের উন্নয়নমূলক খাতসমূহে সরকারি বরাদ্দ হ্রাস, সরকারি প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে জনবল সংকোচন করাসহ সার্বিকভাবে সরকারি ব্যয় হ্রাসের জন্য চাপ সৃস্টির প্রবণতা চলে আসছে। এমনকি সাহায্য দেয়ার ক্ষেত্রে, অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে জুড়ে দেয়া হচ্ছে সরকারি ব্যয় সংকোচনের জন্য নানা রকমের শর্তাবলী। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ব্যয় সংকোচনের অর্থনীতি কার্যকরও হয়েছে পুরোদমে। যেমন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালী, গ্রীস, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জাতীয় অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে এটাই মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফল যা হয়েছে তা সচেতন পাঠক সকলেই অবহিত। যে সমস্ত দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি সেই সকল দেশে যদি সরকারি ব্যয় সংকোচনের মাত্রাও তীব্র হয়ে যায়, তখন অর্থনীতি তার স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী যেখানে পৌঁছার পৌঁছে যায়। উল্লেখিত দেশসমূহে সরকারি ব্যয় সংকোচনের ফলে মানুষ হয়েছে কর্মহীন, কমেছে ক্রয়ক্ষমতা, নাগরিকরা হয়েছে দরিদ্র, মানবেতর জীবন-যাপন করছে নাগরিকরা। কয়েকটি দেশেতো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই প্রশ্নের সন্মুখীন হয়েছে। শুধু কি তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ? যুক্তরাজ্যের মতন শিল্পোন্নত দেশ স্বাস্থ্যখাতসহ সেবামূলক খাতসমূহের ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে তো জনরোষে পতিত হলো। গত সপ্তাহে ব্যয় সংকোচন নীতির অভিভাবক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ব্যয় সংকোচন নীতির প্রভাব আমেরিকার সাধারণ জনগণের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে উল্লেখ করে ব্যয় সংকোচন নীতির বিষয়ে ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিন্তা-ভাবনা করছেন বলে অভিমত দিয়েছেন। আসলে বাস্তবে তা কি সম্ভব? পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের সচেতন মানুষের মধ্যে এই প্রশ্ন আসাটা খুবই স্বাভাবিক যে, দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়নশীল ও পশ্চাত্পদ দেশসমূহের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি কার্যকর করে যে মহা সর্বনাশ হয়েছে তখন তো মার্কিন মুল্লুকের কেউতো ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উচ্চারণ করেন নি। প্রসংগত, একথাও বলা যায় যে, ১৯২৯ সালে মহামন্দাকালে লর্ড কেইনস মন্দাকালে সংকট মোকাবেলায় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কথাইতো জোর দিয়ে বলেছেন। এই অবস্থায় আমরা দেখছি যে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সংকট মোকাবেলায় যেখানে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকতর Cash Flow বা নগদ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা সেখানে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার বিপরীতমুখিতা। বাস্তবিক অর্থেই উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশসমূহে প্রয়োজন সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি। উন্নয়নমূলক খাতসহ সেবা খাতসমূহে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে কর্মক্ষম মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এবং সমপ্রসারিত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি। প্রশ্ন আসতে পারে সরকারি আয় বৃদ্ধি নিয়ে। এক্ষেত্রে আয়করসহ অন্যান্য কর ধার্য ও আদায়ের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকলেই সরকারি আয় বৃদ্ধি সম্ভব। লেখক: অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বনানী, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন