দেশের সবার মুখে এখন একই প্রশ্ন- শেষ পর্যন্ত কী হবে? দেশ কী এভাবেই এক ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলবে? মানুষের জীবনে কী স্বস্তি বলে কিছু আসবে না। এ সব প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। শান্তিপ্রিয় মানুষেরা ঘুম থেকে উঠে একটি সুন্দর সংবাদের জন্যে প্রতীক্ষা করলেও সেই সংবাদ এখন সুদূরপরাহত। উল্টো প্রতিদিনই টিভি চ্যানেল আর দৈনিক পত্রিকায় তীব্র প্রতিহিংসা, নৃশংসতা আর নির্মমতার ছড়াছড়ি। প্রতিদিনই নিহতের তালিকা বাড়ছে । বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। হামলা-মামলা গণগ্রেফতার চলছে। রিম্যান্ডে নেয়া হচ্ছে ইচ্ছেমতো। দুর্বৃত্তদের ক্রোধে ট্রেন উল্টে পড়ছে। সব মিলিয়ে কোনো শান্তি বা স্বস্তির সংবাদ নেই। চলমান যে জটিল সংকট তা থেকে উত্তরণের কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ঢালাওভাবে চলছে কেবলই দোষারোপ, আর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ। কে ভালো আর কে মন্দ তার বিজ্ঞাপন চলছে চারদিক। মন্ত্রী মহোদয়েরা বলছেন বিরোধীদের দমনে আর কোনো ছাড় নয়, আরো কঠিন হবেন তারা। তার মানে আরো সাধারণ মানুষ হত্যা হবে। আরো গাড়ি-বাড়ি সম্পদ নষ্ট হবে। সেই অশনি সংকেতও পাওয়া যাচ্ছে চারদিক থেকে। কেমন যেনো চারপাশ কেবলই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। আলোর কোনো নিশানা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ১৬ কোটি মানুষের কথা কী কেউ ভাবছে? তাহলে দেশটা যাচ্ছে কোথায়? এভাবেই কী চলবে? এ দায় কার?
এক কথায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না। এক ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতার সমাজ যেনো গড়ে উঠছে। বিরোধী দল বলছে সরকারের মাঝে সামান্যতম সহানুভূতি নেই। তারা পাখির মতো মানুষ গুলি করে মারছে। মানুষ হত্যা করাটাই যেনো সরকারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিপীড়ন, নির্যাতন হয়রানির সর্বোচ্চ ব্যবহার চলছে। শত শত মামলা আর চার্জশিটে হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফিরতে পারছে না। নিরীহ মানুষকে মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। মামলা ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যও জমে উঠেছে সর্বত্র। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার সবখানেই এখন পরাভূত। যেমনটি বিরোধী দল বলছে সরকার দেশ পরিচালনায় একেবারেই ব্যর্থ। সুশাসন আর জবাবদিহিতার কথা বললেও এই সরকার কুশাসনের নজিরই স্থাপন করেছে। গণতন্ত্রের প্রতিও তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। প্রতিপক্ষকে দমন করে সরকার কেবলই ক্ষমতায় থাকতে চায়। হত্যা আর খুনে মেতে উঠেছে সরকার। একচোখা নীতিতেই সবকিছু পরিচালনা করছে তারা। আসলে আমরা সবকিছইু একচোখে দেখছি। দারুণভাবে বিভাজন তৈরি করছি সর্বত্র। আর তাই সহানভূতিটাকেও আমরা দলীয়করণ করে ফেলেছি। পরস্পরের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাবোধও হারিয়ে ফেলছি।
ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দমনে সরকার এখন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ইচ্ছেমতো কোমরে দড়ি দেয়া হচ্ছে। টানা হ্যাঁচড়া করা হচ্ছে। নানা প্রেক্ষাপট ঘিরে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী পরিষ্কার। আমরা দেখছি এ বিষয়ে একেকজন একেক রকম কথা বলছেন। আইন প্রতিমন্ত্রী বলছেন এক কথা আবার অন্যমন্ত্রী বলছেন অন্য কথা। দলের যুগ্মসম্পাদক মাহবুব উল হানিফ বলছেন একরকম, অন্যরকম বলছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ২ এপ্রিল মাহবুব উল হানিফ মতিঝিলে জাতীয় শ্রমিক লীগের এক সমাবেশে বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি ফ্যাসিবাদী দল। দেশব্যাপী জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। তাই দলটিকে নিষিদ্ধ করা সময়ের ব্যাপার। নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। পরের দিনই বুধবার দলের সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত সমাবেশে বলেন, শাহবাগের আন্দোলনকারীরা জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি তুলেছে তা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সরকার আইন ও সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ। তাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে হবে। হানিফ এবং আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য পড়লে কী বুঝা যায়? মনে হয় দলীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আশরাফুল সাহেবের চেয়ে এগিয়ে আছেন হানিফ সাহেব। জামায়াতকে নিষিদ্ধের প্রশ্নে নানা মত-অভিমত থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সরকার যদি সবকিছু সামাল দিতে পারে ভালো কথা। কিন্তু বিগত দিনে আওয়ামী লীগের জামায়াত প্রীতির কথাও ভুলে যাওয়া চলবে না।
জামায়াত নিষিদ্ধ হবে কি হবে না সেটা সরকারই ভালো বুঝবে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম বরাবরই একটি মারাত্মক স্পর্শকাতর বিষয়। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি যেমন ঠিক নয়, তেমনি ধর্মের অবমাননাও ঠিক নয়। এদেশে ধর্ম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। ধর্ম সবার। ধর্মের কোনো ধরনের অবমাননা পৃথিবীর কোথাও গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশেও গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষের সংখ্যা অজস্র। স্বভাবতই ধর্মকে যারা বিশ্বাস করে তাদের যুক্তি, আবেগকেও যথাযথ সম্মান জানাতে হবে। আজকে ধর্মকে ঘিরে সরকারের যে বেসামাল অবস্থা এর জন্যে এক ধরনের অতিবিপ্লবীরা বেশি দায়ী। ফেসবুকে চোখ মেললে বুঝা যায় তারা কত ভয়ংকর। কথায় কথায় তারা বিচার করতে চান সবকিছুর। ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চান । কিন্তু কিছু করতে গেলে যে আইন-কানুন লাগে তা তারা বুঝেন না। সবকিছুরই একটা শেষ আছে। কিন্তু সবকিছু দেখে-শুনে মনে হচ্ছে এখন যা হচ্ছে তার কী কোনো শেষ নেই। দেশের একটি শীর্ষ পত্রিকায় সাক্ষাত্কারে চমত্কার কথা বলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেছেন বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে তার অভিঘাত শুধু সরকার বা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উপরেই পড়ছে না নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনও ক্ষতি হচ্ছে। সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চেয়ে জরুরি হলো অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধ করা। নইলে রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তিনি আরো বলেছেন, বর্তমান প্রেক্ষিতে অর্থনীতিতে এমন এক সংকট তৈরি হয়েছে যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসছে না, এলেও ফিরে যাচ্ছেন। ড. হোসেন জিল্লুরের কথায় সহমত পোষণ করেই বলছি- আসলেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চেয়ে এখন জরুরি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যদিয়ে সহিংস অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করা। জনগণের জানমানের নিরাপত্তা দেয়া। সবমিলিয়ে একটি স্বস্তিকর সুপরিবেশ গড়ে তোলা। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরাও এই কথা বলছেন। রাজপথ থেকে রাজনীতি গুটিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু সেই সুস্থ সুন্দর পরিবেশটি গড়ে তোলার দায়িত্ব কার? দুধের বালককে জিজ্ঞেস করলেও বলবে অবশ্যই সরকারের। সরকারই দেশ পরিচালনা করছে। তাদের উপরই সবকিছু বর্তায়। কিন্তু সরকার কী সে পথে হাঁটছে? সরকার কী সমঝোতা, সংলাপের পথে অগ্রসর হয়েছে? আগেই বলেছি সরকারের মাঝে চরম সমন্বয়হীনতা লক্ষণীয়। তারা মুখে বলছেন এক কথা, কাজে করছেন আরেকটা। হঠাত্ করেই কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেফতার করা হলো। আবার বলা নেই, কওয়া নেই সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম এবং সহযোগিরা হেফাজত ইসলামের ডাকা লংমার্চ প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে হরতাল দিয়ে বসলো। তার মানে কোথাও সরকারে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার হাঁটছে একদিকে আবার তাদের অনুসারীরা অন্যদিকে। বর্তমান প্রেক্ষিতে একটা বিষয় সুস্পষ্ট হয়েছে যে সংলাপ সমঝোতা ছাড়া গায়ের জোরে কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সরকার হাড়ে হাড়ে সেটা টেরও পেয়েছে। আমাদের মতো দেশে ধর্ম থাকলে ধর্মীয় অনুভূতিও থাকবে। আগেও ছিল। দেশের বিভিন্ন জায়গাতে সরকার সেটা ভালোভাবেই টের পেয়েছে। কিন্তু এটাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কোনো কারণ নেই।
রাজনীতিতে উত্থান আর পতন সবই আছে। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় গেলে সব ভুলে যাই। খুব দূরে যাওয়ার দরকার নেই। ভারতের কলকাতায় চোখ রাখি। সর্বশেষ নির্বাচনে সিপিআই-এর জোর বিশ্বাস ছিল তাদের লালদুর্গের পতন ঘটানোর মতো শক্তি মমতার নেই। কিন্তু মমতার দল বিমান বসুর দলকে এতোটাই নির্মমভাবে পর্যদস্তু করলো যে মুখ দেখানোর কায়দাই থাকলো না। শেষে বামপন্থীরা সংবাদ সম্মেলনে বললেন, জনগণের রায় তারা মেনে নিয়েছে। আবার জনগণের রায় নিয়েই তারা ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই উদারতা দেখানোর সাহস নেই কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের। ক্ষমতার অন্ধ মোহে আমরা শুধু তলিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারে। আমারা একটা সুন্দর সকাল চাই। কিন্তু এ কোন্ সকাল ? রাতের চেয়েও অন্ধকার...’ । এই অন্ধকার থেকে উঠে আসতে হলে সরকারকে পাল্টাপাল্টির পথ থেকে সরে এসে ১৬ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় আনতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। সরকার সে পথে এগুলেই রাজনীতির মাঠ হবে মসৃণ। সুন্দর সকাল এসে পৌঁছাবে আমাদের দোরগোড়ায়।
লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
[email protected]
