মিয়ানমারে বেসরকারি মালিকানায় পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি মিলিয়াছে ৫০ বত্সর পর। সেন্সরশিপও তুলিয়া নেওয়া হইয়াছে। অর্থাত্ এখন হইতে পত্রিকায় কি ছাপা হইবে না হইবে তাহার জন্য পূর্বাহ্নে সেন্সর কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে নো-অবজেকশান সার্টিফিকেট লইতে হইবে না। গত ১ এপ্রিল হইতে এই ব্যবস্থা কার্যকর হইয়াছে। অবশ্য এইরূপ অনুমতি প্রদান করা হইবে বলিয়া গত ডিসেম্বরেই ঘোষণা দেওয়া হইয়াছিল। সেইটাই এখন বাস্তবায়িত হইল। এমতাবস্থায় বিভিন্ন ভাষায় ষোলটি পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পাইয়াছে। অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির একটি মুখপত্র প্রকাশেরও আয়োজন শুরু হইয়াছে। আশা করা যায়, এই মাসের শেষ সপ্তাহে পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা শুরু হইবে। দুয়েকটি পত্রিকা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হইতে শুরুও করিয়াছে। পর্যবেক্ষক মহল বিষয়টিকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে একটি বড় অগ্রগতি বলিয়া বিবেচনা করিতেছেন।
প্রসঙ্গত এইখানে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, ১৯৬৪ সালের আগে পর্যন্ত মিয়ানমারে চৈনিক, বার্মিজ ও ইংরেজিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় তিরিশটি দৈনিক প্রকাশিত হইত। ঔপনিবেশিক শাসনামলেও দেশটিতে বেসরকারি মালিকানায় সংবাদপত্র ছিল এবং সেইগুলি স্বাধীনভাবে খবর ও মতামত প্রকাশ করিতে পারিয়াছে। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর বোধগম্য কারণেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আরও সংহত হইয়াছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ১৪ বত্সরের মাথায় আসিয়া বাক ও ব্যক্তির স্বাধীনতা নির্বাসিত হয়। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন বার্মার ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং দেশে জারি হয় সামরিক শাসন। মার্শাল ল’র মধ্যেও বত্সর দু’য়েক এইখানে বেসরকারি মালিকানায় পত্রিকা বাহির হইয়াছে, যদিও সেন্সরশিপ ছিল কঠোর। ১৯৬৪ সালে আসিয়া সরকারি মালিকানায় কয়েকটি পত্রিকা রাখিয়া অন্যসব পত্রিকা বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। সামরিক জান্তার অধীনে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য বেসরকারি পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়। সমাজতন্ত্র ও বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা একসঙ্গে থাকিতে পারে না। ব্যক্তি বা বেসরকারি মালিকানায় সমাজতান্ত্রিক দেশে সংবাদপত্র সেতো অকল্পনীয়।
জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। নয়া সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে এই সামরিক স্বৈরাচারের। নূতন সামরিক জান্তা গণতন্ত্র ফিরাইয়া দেওয়ার অঙ্গীকার করিলেও উহা প্রহসন ছাড়া কিছুই ছিল না। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অং সান সুচির পার্টি বিজয় লাভ করিলেও, তাহাকে ক্ষমতায় যাইতে দেওয়া হয় নাই। উল্টো গৃহবন্দী করা হয়। বন্দী অবস্থায় অং সান সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত হইলেও তাহার দেশে গণতন্ত্রের মুক্তি ঘটে নাই। তাহার নিজের তো নহেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা—তাহাতো অনেক দূরের কথা। বন্দীত্বের প্রায় কুড়ি বত্সর পর সামরিক জান্তার সহিত আপসরফার মধ্য দিয়া অং সান সুচি মুক্তি পান। তিনি এখন মিয়ানমারের বিরোধী দলীয় নেত্রী। সামরিক জান্তার সহায়ক। জান্তা ও নোবেল লরিয়েট গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সুচির মধ্যে চমত্কার সখ্য গড়িয়া উঠিয়াছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। অতঃপর বেসরকারি মালিকানায় পত্রিকা প্রকাশের পথ খুলিয়াছে— ইহাও একটি ভাল সংবাদ বৈকি।
ইহার মানে অবশ্য ইহা নহে যে, জান্তা শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মিয়ানমারে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হইয়া গিয়াছে। অবশ্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যে কী, তাহা লইয়া তর্ক এবং কূটতর্ক উভয়ই রহিয়াছে। অনেকেই বলেন, এই স্বাধীনতার মানে মালিকের স্বাধীনতা। আরেক দল চাহেন সাংবাদিকের স্বাধীনতা। প্রকৃতপক্ষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলিতে যে কোনো ব্যক্তি মালিক বা ব্যক্তি সাংবাদিকের স্বেচ্ছাচারিতা বুঝায় না, সেই কথা অনেকেই মানিতে চাহেন না। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে ইহা মালিকেরই স্বাধীনতা। তাহারই মত ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়া থাকে পত্রিকার পাতায়। ইহাই বাস্তবতা। মিয়ানমারেও তাহার ব্যতিক্রম ঘটিবে না, ঘটিবার নহে। বেসরকারি মালিকানায় সেখানে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি তাহারাই পাইয়াছেন, যাহারা শাসক গোষ্ঠীর সহিত সখ্য গড়িয়া তুলিতে পারিয়াছেন। তাহাদেরই মত ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটিবে— এইসব সংবাদপত্রে। তবু, নাই মামার চাইতে কানা মামা ভাল। যেইখানে একটিও বেসরকারি পত্রিকা ছিল না, সেইখানে নিদেনপক্ষে ১৬টি কাগজ বাহির হইতেছে, তাহা কম কিসে!
