[ রা জ নী তি ]

সংঘাত-সহিংসতায় অনিশ্চিত গন্তব্যে দেশ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৬
প্রধান দুই দলের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে দেশের সর্বস্তরে আজ গভীর সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দুই দশক ধরে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও সংসদকে অকার্যকর রেখে বিরোধী মতকে দমন ও রাজপথে সহিংসতাকে সমাধানের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। আলোচনা ও সমঝোতা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পূর্বশর্ত; কিন্তু সংসদের বাইরেও কোনো ধরনের সংলাপ এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। বরং হিংসা, সহিংসতা ও বলপ্রয়োগকে ক্ষমতামুখী রাজনীতির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে সরকার ও বিরোধী দল। সরকারের ভিন্নমতকে গায়ের জোরে স্তব্ধ করার নীতি আর দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে বিরোধী দলের হরতাল-নৈরাজ্যকে বেছে নেয়ার কারণে গত কয়েক মাস ধরে দেশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গুজরাটি ভাষা থেকে আসা ‘হরতাল’ শব্দে ‘হর’ অর্থ প্রত্যেক, ‘তাল’ মানে তালা; অর্থাত্ প্রতি দরজায় তালা। অভিধানে হরতাল অর্থ: ধর্মঘট; বিক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য যানবাহন, হাট-বাজার, দোকান-পাট, অফিস-আদালত ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করা। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে হরতাল অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। তবে আমাদের দেশে হরতাল নিয়ে রাজনৈতিকভাবে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সরকারি দল মনে করে হরতাল ক্ষতিকর; আর বিরোধী দলের অভিমত হরতাল প্রয়োজন। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে তাই দাবি আদায়ে অনন্যোপায় হয়ে হরতাল-সহিংসতায় মেতে উঠেছে বিরোধী দল। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে ১৮ দলীয় জোটের দাবির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই সরকারের। বিরোধী দলের দাবি ও কর্মসূচির ব্যাপারে সরকার লা-পরোয়া ভাব দেখালেও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। হরতাল জাতীয় বিপুল ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের জীবনকেও করে বিপন্ন। চট্টগ্রামে ইজি বাইক চালক মুসার গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, নবম শ্রেণীর ছাত্রী অন্তুর চোখে আঘাত পাওয়া, মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর চোখ নষ্ট হওয়া কিংবা নীলফামারীতে শিশুশিক্ষার্থীদের ওপর হামলা— অসংখ্য অঘটনের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, দেশে এখন সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। নেই স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। প্রতিটি হরতাল পালনের আগে ও হরতাল পালনের সময় নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে চরম আতংক আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মানুষ। জীবন-জীবিকার জন্য স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না সাধারণ জনগণ। প্রায়শই প্রাণহানি ঘটছে। যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। নাশকতার শিকার হচ্ছে যাত্রীবাহী ট্রেন। দূরপাল্লার বাস কিংবা ট্রেন—কোনোকিছুই এখন আর নিরাপদ নয়। রাজনৈতিক সংঘাত আর নৈরাজ্য এখন আর রাজনীতির সংকীর্ণ পরিসর কিংবা কর্মসূচির দিনক্ষণের মধ্যে সীমিত থাকছে না। এসব সহিংস কর্মসূচির আঘাত ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। সর্বত্র এখন ‘হরতাল আতংক’ বিরাজ করছে। আতংকিত মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন আর পরিকল্পিত ছকে বাঁধা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি এতোটাই অস্বাভাবিক যে, মানুষের সাপ্তাহিক ছুটি আর কর্মময় দিন—কোনোটাই আর নিশ্চিত নয়। শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিলের চিন্তা করছে সরকার। অতীতে এসএসসি কিংবা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার দিন হরতাল দেয়ার রেওয়াজ না থাকলেও এখন আর এতোটা উদার হতে নারাজ বিরোধী দল! স্বাভাবিক জীবনযাত্রা—দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা, সামাজিক আনন্দ-উত্সবের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই এখন। ৩৬ ঘণ্টার হরতালের ফাঁদে পড়ে ভাঙচুরের ভয়ে গাড়ি নয়, পায়ে হেঁটে ওয়ালিমা অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছে বর-কনেকে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জীবনের পরম দিনটিতেও এমন উত্কণ্ঠা! বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের দমন নীতির কারণে যেমন প্রাণহানি ঘটছে; তেমনি বিরোধী দলের নেতাকর্মী—বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের হাতে পুলিশও প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে। চলমান সহিংসতায় প্রাণে বেঁচে গেলেও দুঃস্বপ্ন আর কষ্টের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে অনেককে। আবার ঘনঘন হরতাল ও সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত ডেকে এনেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন উত্পাদনশীল খাত, রপ্তানিমুখী শিল্প, ব্যাংক, বীমা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, মানব সম্পদসহ দেশের সকল অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। হরতালে একদিনে ক্ষতির পরিমাণ কত? টাকার অঙ্কে এই হিসাব বের করা বেশ জটিল। দেশে হরতালের ক্ষতির ভয়াবহতা কত, তা যে সরকার ও বিরোধী দল জানে না, তা নয়। যখন ক্ষমতায় থাকে, এর হিসাব তারা সংসদ ও সংবাদপত্রে প্রায়ই সরবরাহ করে। ২০০৫ সালে ইউএনডিপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী একদিনে ক্ষতি হয় ৫০০ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব থেকে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে একদিনের হরতালে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশে দৈনিক ২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ী সংগঠন ডিসিসিআই তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানিয়েছে, বছরে ৪০টি হরতাল পালিত হলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৬৪,০০০ কোটি টাকা। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হরতাল খুবই নেতিবাচক। কারণ যেসব দেশে আমরা রপ্তানি করি, সেসব দেশে হরতাল পরিচিত নয়। সেখানে আমাদের ভাবমূর্তি, ব্র্যান্ডিং সবই ক্ষুণ্ন হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যাপক, যা টাকার অঙ্কে হিসাব করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের। গত দু’মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের রপ্তানিযোগ্য পোশাক আটকে গেছে। মূলত আগামী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই দেশ ক্রমশ অস্থিতিশীল ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। বর্তমানে সরকারের ছক অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে ২৫ অক্টোবরের আগে আমাদেরকে আরো কত কী দেখতে হয়, কে জানে? এমন একটি সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিবেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিরোধী দল কেন— দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহল কারো কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হবে না। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে যুক্তি দেখালেও সরকার এখনো এ বিষয়ে নির্বিকার। অধিকন্তু, যেখানে পারস্পরিক আস্থাহীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব প্রকট, যেখানে দলীয় অনুগত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের নেতৃত্বে তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা হবে, সেখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে— এটা কতটুকু যৌক্তিক? সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি জাতীয় দৈনিকের জনমত জরিপে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে ‘না’ বলেছেন ৭৬ শতাংশ মানুষ। জনমত, বিরোধী দলের একদফা দাবি-আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মহল ও জনসমাজের পরামর্শকে উপেক্ষা করে সরকার যদি সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে একদলীয় নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করে, তাহলে দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হবে? নির্বাচিত সরকার কতদিন টিকে থাকতে পারবে? বরং ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এভাবে জবরদস্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ সরকার গঠন করলে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় মেয়াদে তারা আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে। দেশ, গণতন্ত্র ও রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তার সন্মুখীন হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, হেফাজতে ইসলামের ৬ এপ্রিল লংমার্চ কর্মসূচিকে ঘিরে গত কয়েকদিনে তাদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা ও সমঝোতার প্রচেষ্টায় একটি বিষয় আরেকবার পরিষ্কার হলো যে, শুধু ধর্মভিত্তিক দলগুলো নয়; বরং বড় বড় দলগুলোর ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজীব্য। ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ধর্মপ্রিয় মানুষেরা সরকারকে যাতে ইসলাম-বিরোধী মনে না করে, সেজন্য সরকার নিজ থেকেই হেফাজতে ইসলামকে লংমার্চের কর্মসূচি থেকে ফিরিয়ে আনতে একের পর এক আলোচনায় বসেছে। এমনকি হেফাজতে ইসলামের বেশকিছু দাবি মেনে নেয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও আন্দোলনরত ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দাবির প্রতি সম্পূর্ণ নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার যদি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে, তাহলে নির্দলীয় সরকারের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ হবে না কেন? প্রকৃতপক্ষে, পরশ্রীকাতরতা ও হিংসার রাজনীতি এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, দেশের ক্ষমতা যদি তৃতীয় কোনো শক্তির হাতে চলে যায় তা-ও ভালো, তারপরও শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে রাজি নন বেগম জিয়া। একইভাবে খালেদা জিয়া আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, সেটাও চান না শেখ হাসিনা। কিন্তু, সরকার ও বিরোধী দলকে ভুলে গেলে চলবে না, গায়ের জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া কিংবা রাজপথে সহিংসতার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা দেশের জন্য আরও বিপর্যয় ডেকে আনবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হিংসা ও হানাহানি কোনোভাবেই সুফল বয়ে আনে না। বাস্তবিক পক্ষে নাগরিকদের একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান এবং নিরাপত্তা বিধান সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব। সংলাপ শুরু করতে যত বিলম্ব হবে, জীবন ও সম্পদের ক্ষতি তত বাড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই সরকারের উচিত আগামী নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসা। অন্যথায়, দেশে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে, সেক্ষেত্রে সময়ের দাবি পূরণে তৃতীয় কিংবা অগণতান্ত্রিক কোনো শক্তি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য প্রধানত সরকারই দায়ী থাকবে। বিরোধী দলকেও হরতালের নামে নৈরাজ্য ও হানাহানির পথ পরিহার করতে হবে। এক-এগার পরবর্তী পরিস্থিতি দেশ, গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য কতটা সুখকর (!) হয়েছে, তা সম্ভবত এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাননি কেউ। এখন দেখা যাক, সরকার ও বিরোধী দলের শুভ বুদ্ধির উদয় কখন হয়? লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন