পানি হচ্ছে আমাদের জীবনের অতি প্রয়োজনীয় বস্তু, যার উপর নির্ভর করছে প্রতিটি শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। সেজন্য এটাকে অনেক সময় মাস্টার সলভেন্ট বলা হয়ে থাকে। আমরা যদি জীবদেহের ক্ষুদ্রতম একক কোষ নিয়ে আলোচনা করি তাহলে অতি সহজেই ধারণা করতে পারি যে, গাছপালা, পশুপাখী সবার জীবনেই একটা প্রধান ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু যখন প্রাকৃতিক বা মানুষের সৃষ্টির কারণে ঘনত্ব এবং স্বাভাবিক ভৌতিক বা রাসায়নিক ধর্মের পরিবর্তন ঘটে তখন সে আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না বা পান করা যায় না, দূষিত হয়ে যায়। তার মানে পানীয়জল অর্থ হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যহানিকর জীবাণু ও রাসায়নিক পদার্থ থেকে মুক্ত। যদিও রাসায়নিক দিক থেকে প্রকৃত অর্থে বিশুদ্ধ হয় না, কোনও না কোনওভাবে নানা ধরনের গ্যাস বা খনিজ পদার্থ প্রাকৃতিক উপায়ে মিশ্রিত থাকে, কিন্তু এ মিশ্রিত পদার্থ এত কম পরিমাণে থাকে যার জন্য সাধারণ ধর্মের কোনও বিচ্যুতি হয় না এবং পানি পানীয় হিসেবে ব্যবহার করলে কোনও ক্ষতি হয় না। অন্যদিকে, এ প্রদূষণের পরিমাণ বেশি হলে দূষিত হয় ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে যা সমস্ত জীবজগতের উপর হানিকারক প্রভাব বিস্তার করে। অন্যদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় শহরাঞ্চল বা শহরতলিতে পানীয়জল সরাসরি নদী, সরোবর, সমুদ্র, মহাসমুদ্র প্রভৃতি থেকে বিভিন্ন পরিস্রাবণের পর সংগ্রহ করা হয়। এ সমস্ত প্রায়ই বিভিন্ন কারণে দূষিত হয়ে থাকে। জীবাণুজনিত দূষণ একটি প্রধান কারণ। পানীয়জলের এ প্রকার দূষণ মাটিতে বসবাসকারী জীবাণু, বায়ুতে বসবাসকারী জীবাণু, তাছাড়া বিভিন্ন প্রকারের স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে নির্গত জঞ্জাল দ্বারা হতে পারে। এর মধ্যে প্রথম কারণটা হচ্ছে অন্যতম এবং এর নানা ধরনের সংক্রামক রোগের জীবাণুগুলো কোনও না কোনও উপায়ে পানীয়জলে মিশে যায়। মানুষের যে সমস্ত রোগ-জীবাণু প্রায়ই পানিকে সংক্রামিত করে তার মধ্যে টাইফয়েড, পেরাটাইফয়েড, জন্ডিস, পলিওমাইলেটিস, ভাইরেল হেপাটাইটিস, ইত্যাদি প্রধান। তাছাড়া, মাটি ও বায়ুতে কয়েক ধরনের জীবাণু থাকে যেগুলো বিশেষ করে গাছপালা, পশু-পক্ষিদের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে।
পানিতে রোগ-জীবাণুর পরিস্থিতি নির্ভর করে মূলত দ্রবীভূত খাদ্যদ্রব্য, জীবাণুনাশক জলীয় পরিবেশ, অন্য জীবাণুদের সংখ্যাও প্রকৃতির উপর। কম গভীরতাসম্পন্ন জলাশয়ে খাদ্যবস্তুর প্রাচুর্য থাকার ফলে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু পাওয়া যায়। প্রবাহমান নদী ও অন্য জলাশয়ের নানা স্থানে জীবাণু সমস্যার প্রকৃতিও বিভিন্ন প্রকার। নোংরা বিভিন্ন বস্তু থাকা নালাগুলোতে সংক্রামক জীবাণুর সংখ্যা বেশি থাকে, সেগুলো নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এ পানি কতটুকু নিরাপদ মানুষের ব্যবহারের পক্ষে। এর পরিমাপ নির্ধারণ করা হয় বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি-র দ্বারা। অর্থাত্ বিভিন্ন ধরনের নোংরা পদার্থকে পচিয়ে নষ্ট করে দেয়ার জন্য বায়ুজীবী জীবাণুর যে পরিমাণ দ্রবীভূত অক্সিজেন যখন তুলনামূলকভাবে কম থাকে তখন দূষিত বলা হয়। অর্থাত্ বিওডি-এর পরিমাণ নির্ভর করছে বর্জ্য পদার্থের উপর। বর্জ্য পদার্থ বেশি হলে বিওডি-র মাত্রা বাড়বে এবং মিশ্রিত অক্সিজেনের মাত্রা কমবে।
সবশেষে যে প্রতিকারের পরামর্শটা দেয়া উচিত সেটা হল, এ ধরনের যে কোনও পানীয়জলের প্রদূষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা কারণ আমরাই অনেক সময় অজ্ঞাতসারে বৃহত্তর প্রদূষকের কাজ করে থাকি। সবশেষে একটা কথা বলা যায় যে আমরা পানিসম্পদে ধনী এ বিষয়ে যদিও কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু এ সম্পদও তো অসীম নয়, তার সঙ্গে আছে আরও অনেক ধরনের যোগান। যেমন জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বর্তমান কালের শিল্পোদ্যোগের ব্যাপক প্রসার। সেজন্য পানির প্রয়োজনটাও অনেক বেশি। কিন্তু এখনও যদি এ পরিবেশের ভারসাম্যকে রক্ষা করার কাজে না লাগা যায়, যদি আমন্ত্রণ করি সে প্রাকৃতিক বিপর্যয় তবে আমরা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য রেখে যাব এক বিভীষিকাপূর্ণ জীবন, যেখানে থাকবে শুধু নবজাতকের কান্না এবং বার্ধক্যের আর্তনাদ। তাই অত্যন্ত বিচক্ষণ দৃষ্টিতে দেখে মানুষকে সচেতন করে আমাদের এ সঙ্কটের মোকাবিলা করা দরকার, অন্তত প্রাথমিক পদক্ষেপটুকু শুরু করা বিশেষ প্রয়োজন ঠিক এখন এ মুহূর্ত হতেই।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার (১ম স্বর্ণপদক) প্রাপ্ত।
