[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পদ্ধতি

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৮
সাম্প্রতিককালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবির, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন কর্মসূচি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধের নামে সংঘটিত নানাবিধ তাণ্ডব, সহিংসতা নিয়ে দেশবাসী গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। নিয়মতান্ত্রিকতার পরিবর্তে সমস্যা সমাধানের বিকল্প হিসেবে রাজপথের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে একটি সংবিধান বহির্ভূত পদ্ধতি। মিছিল-মিটিং, ধর্মঘট, হরতাল এবং অবরোধের মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডই সাধারণত রাজপথের আন্দোলনের হাতিয়ার। এ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। দাবি আদায়ের নামে জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারে। তাই যতদিন রাজপথের আন্দোলন সমস্যা সমাধানের কিংবা রাজনৈতিক দাবি আদায়ের মাধ্যম হিসেবে থাকবে, ততদিন আমাদের রাজনীতিতে সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে এবং জাতি হিসেবে নিজেদের এগিয়ে নিতে হলে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার বিকল্প নেই। আর এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপযুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করা। পদ্ধতিই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাবে। আর মানসিকতার পরিবর্তন হলেই আচরণ বদলাবে এবং আচরণ বদলালেই রাজনীতিতে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতাভিত্তিক সংস্কৃতি সৃষ্টির পথ প্রশস্ত হবে, ঘৃণাবোধের অবসান ঘটবে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাজনীতিতে প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও ঘৃণাবোধের পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে বাধ্য। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন যে, চোখের বদলে চোখ নিলে সারা পৃথিবী অন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে একটি বিষয় খুব সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ক্ষমতায় থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এবং ক্ষমতায় না থাকলে তাদের মানসিকতা স্ববিরোধী আচরণের সামিল। এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা অর্জনের নিমিত্তেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। উল্লেখ্য যে, বিগত নবম সংসদ নির্বাচন-পূর্ব জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘একটি কার্যকর সংসদ দায়িত্বশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, রাষ্ট্র ও সামাজিক সকল শক্তির মধ্যে কার্যকর সমঝোতা’ প্রতিষ্ঠার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থা উপলব্ধি করা সম্ভব। নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতন্ত্র রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও কার্যকর অর্থে তা বাস্তবায়নের মানসিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশে ৯০ এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা বিদ্যমান। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সকল সমাজ, সচেতন নাগরিক, এমনকি সাধারণ জনগণকেও আমাদের বিরাজমান অসহিষ্ণু, দ্বন্দ্বাত্মক ও কলহপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে প্রতিশোধের পরিবর্তে সবকিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার, সরকারে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার না করার এবং বেগম খালেদা জিয়ার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সহযোগিতা নেয়ার, বিরোধী দলকে ডিপুটি স্পিকারের পদ দেয়ার এবং রাজি হলে বিরোধী দল থেকে মন্ত্রিত্ব দেয়ার কথাও সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্ত করেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন: ‘আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখব।’ এগুলো ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন আহ্বানের কথা শুনে সেদিন গোটা জাতি গর্বিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতি সম্পর্কে দারুণ আশার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু জাতির সেই আশা আজ ধুলায় ভুলুণ্ঠিত হতে চলেছে। সরকার যেমন গণতন্ত্র রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি বিরোধী দলও সংসদ কার্যকর ও রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির অঙ্গীকার পূরণে অনীহা দেখিয়েছে। এটি সুস্পষ্ট যে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ গুণগত পরিবর্তন মোটামুটিভাবে আমাদের একটি জাতীয় অঙ্গীকার ও সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ জনগণও মনে-প্রাণে তা চায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামপ্রতিক সময়ে আমাদের শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে ঘৃণা বা প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করার কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং মনে হয় যে, মাননীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সকল নেতা-কর্মী দলীয় প্রধানকে খুশি করার জন্যই যেন এমন অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। গোট জাতি আজ এমন অশুভ প্রতিযোগিতায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সরকার, বিরোধী দলসহ সকলকে এ বিষয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। বিশেষ করে আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, সরকার এবং বিরোধী দল কি এর পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভেবে দেখেছে? বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যারা যান, তারা রাতারাতি রাষ্ট্রের সবকিছুর ‘মালিক’ বনে যান। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে শুরু করে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সবকিছুই দখলে নিয়ে নেন। আর এগুলো অনেক ক্ষেত্রে তারা কর্মী-সমর্থক ও আপনজনদের মধ্যে ফায়দা হিসেবে বিতরণ করেন। এভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের ধারক-বাহক না হয়ে বহুলাংশে সিন্ডিকেটের রূপ ধারণ করে। এগুলো হচ্ছেই শুধু গণতন্ত্রের পথে না হাটার কারণে। বিজয়ীদের পক্ষ থেকে বিরুদ্ধ-মতের প্রতি সম্পূর্ণ অশ্রদ্ধা এবং পরাজিতদের বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতার মানসিকতার অপসংস্কৃতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই দলের প্রয়োজন হয়। দলের সৃষ্টি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে সুনির্দিষ্ট আদর্শ বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে বিতরণ নয়। তাই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দলবাজি এবং ফায়দাবাজির কোনো অবকাশ নেই। কারণ রাষ্ট্রের সকল সম্পদের মালিক জনগণ এবং সরকারের দায়িত্ব ‘রাগ বা বিরাগের বশবর্তী’ না হয়ে দল-মত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা। বড় দল দুটির প্রধানদের ব্যক্তিগত রাগ-বিরাগের পেছনে রয়েছে বহু উদ্দীপক সৃষ্টিকারী ঘটনা। এখানে ৭৫’এর হত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা উল্লেখ করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীনরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নে লিপ্ত হয়ে পার পেয়ে যান। রাজনীতিকে যারা জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তাদের করাল গ্রাস থেকে রাজনীতিকে মুক্ত না করতে পারলে এর বিপরীতে অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতায়ন আসবে। যা ভবিষ্যতে ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সর্বক্ষেত্রে নৈতিক আচরণ। নৈতিকতা বিবর্জিত রাজনীতি ভণ্ডামির সামিল। বদিউল আলম মজুমদার-এর রচিত ‘দিনবদল, গণতান্ত্রিক শাসন ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ নামক গ্রন্থে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান-এর একটি কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন যে, রাজনীতি পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম পেশা, কিন্তু ক্রমান্বয়েই তা সবচেয়ে প্রাচীনতম পেশা হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং আদালতের নির্দেশ মেনে চলা তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকার সংরক্ষণে অবিচল থাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার না করা, কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি নৈতিক আচরণের বৈশিষ্ট্য। তাই রাজনীতিতে অনৈতিকতার অবসান ঘটলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের পথ সুগম হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের জন্য একইসাথে প্রয়োজন হবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য উপযুক্ত ডিজাইন গ্রহণ করা। সে জন্য গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য একাধিক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে জাতীয় ও স্থানীয়তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ পদ্ধতি চালু হলে রাজনীতিতে জনগণের ক্ষমতায়নের যাত্রা শুরু হবে। পদ্ধতিই দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিতাড়িত করবে। সে সঙ্গে রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা ও শিষ্টাচারসহ অনৈতিকতার অবসান, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা পাবে। এখন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য আরো প্রয়োজন শ্লোগানের পরিবর্তে সময়োপযোগী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালু করা। লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন