নদী শাসন ও অধিক খাল-বিল খনন জরুরি

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২২
নদীমাতৃক সুজলা-সুফলা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের সুজলা-সুফলা কৃষিনির্ভর এই দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ শত শত নদ-নদী যা কেবলমাত্র আমাদের অবহেলায়, উদাসীনতায়, অপরিচর্যায় ও প্রয়োজনীয় নদী শাসনের অভাবে তা ক্রমেই শুকিয়ে মৃত খাল ও মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে যথাযথ নদী শাসনের অভাবে নদীপথের পানির প্রবাহ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ঠিক তেমনি নদী ভরাট হয়ে বর্ষাকালীন সময়ে ভয়াবহ নদী ভাঙনের তীব্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে নদীর দু’ধারের আবাদি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে যেমন নদীপাড়ের শত শত জনগণ সহায়-সম্বল হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে একেবারে নিঃস্ব, হতদরিদ্র ও ভিখারীতে পরিণত হচ্ছে, ঠিক তেমনি আবাদি জমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এদেশে ঘনঘন বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন হতে দেখা যাচ্ছে। এতে যেমন শত শত ঘর-বাড়ি বিনষ্ট হচ্ছে, জীবজন্তু মারা যাচ্ছে, আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে ফলে কৃষির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, দেশ ও জাতি হচ্ছে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও কৃষিখাত হচ্ছে বিপর্যস্ত। প্রতিবছর অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙনের কারণে সরকারের যে পরিমাণ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয় করছে সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে সরকার যদি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে নদ-নদীগুলোকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা যদি উদার দৃষ্টি ও বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারতো তবে আমরা মনে করি, এতে সরকারের অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি অবাদি জমির ভাঙন রোধ, হতদরিদ্রের সংখ্যা কমিয়ে আনাসহ নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের কৃষিখাতের সার্বিক উন্নয়ন, আমদানিকৃত সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদারোধসহ দেশের পরিবেশ ও সার্বিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যেখানে তাদের কৃষিকাজে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বন্যার পানি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ, নদী শাসন ও অধিক খাল-বিল খননের প্রকল্প হাতে নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে পানি সংকট মোকাবিলা করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেখানে আমরা আমাদের এই মৃত নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এখন পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। যা দেশের ভয়াবহ প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণ বলে মনে করি। সমপ্রতিকালে পরপর দু’টি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাইক্লোন তারই প্রমাণ বহন করে। তাই অতিদ্রুত উক্ত সমস্যা সমাধানে এই খাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়াকে জরুরি বলে আমরা মনে করি। দীর্ঘদিন এসব নদ-নদীর সঠিক পরিচর্যা, নীতি নির্ধারকদের অধিক উদাসীনতা, প্রয়োজনীয় উপকরণের স্বল্পতা, বৈদেশিক সম্পর্কিত দেশগুলোর মধ্যে ন্যায্য পানি বন্টন চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও নদ-নদীর আগ্রাসন বন্ধ না হওয়াসহ এইখাত উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ তেমন না থাকায় নদীগুলো শুকিয়ে নদীমাতৃক এইদেশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। বস্তুত এই অবস্থায় আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতিতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যথাযথ পরিচর্যা, নদীখনন, পানিদূষণ ও উপযুক্ত নদী শাসনের অভাবে এখন এদেশে প্রায় সকল নদ-নদী মৃতপ্রায়। যা কৃষিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। নদীর পানি অর্থাত্ ভূপৃষ্ঠের উপরের পানি না থাকার কারণে কৃষিকাজে সেচ প্রদানের জন্য গভীর নলকূপে ব্যাপক ডিজেল ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি ব্যবহূত ডিজেলের আমদানি নির্ভরশীলতাকে কমিয়ে এসব নদ-নদীর পানি কৃষিকাজে অধিক ব্যবহার করতে পারতাম তবে কৃষিখাতে জ্বালানি ভর্তুকি কিছুটা হলে রক্ষা করা যেত। এর ফলে কৃষকদের কৃষিপণ্য উত্পাদিত ব্যয় অনেকটা কম হতো। সরকারের আমদানিকৃত ডিজেলে অধিক ভর্তুকি হ্রাস পেত। বর্তমানে কৃষি ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত পানির অভাব। ফলে চারিদিকে পানি সংকটের হাহাকার দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে আমরা মনে করি, এই সেক্টরে অধিক দলীয়করণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার ও সুশাসনের অভাবে এর সার্বিক উন্নয়ন হচ্ছে না। অপরিকল্পিত নগরায়ন, পরিবেশ দূষণ, পানি দূষণ, অধিক জনসংখ্যা, ঘনবসতি, নদ-নদী খননে ব্যর্থতা, নদী শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের স্বল্পতা, দক্ষ জনশক্তি, এ খাতে অধিক দুর্নীতি এবং কৃষিতে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহার এবং যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এই নদীগুলো বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। যা দেশের কৃষিখাতকে করছে বিপর্যস্ত, প্রাকৃতিক পরিবেশকে করছে বিঘ্ন, পানি সংকট আমাদের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকাকে করছে মারাত্মক বিপর্যস্ত। এই সংকট ও বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে অতিদ্রুত কৃষিকাজে পানি সংকট নিরশন করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নদী শাসন ও অধিক খাল-বিল খনন প্রকল্প গ্রহণ করতে সরকার তথা সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা কামনা করছি। লেখক :লাইব্রেরিয়ান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন