জনশক্তি রফতানি :সরকারি ও বেসরকারি খাত

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩১
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) জনশক্তি রফতানি সংক্রান্ত যাবতীয় সেবা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করিয়া দিয়াছে। তাহারা আর বিদেশে জনশক্তি প্রেরণ করিবে না। গত রবিবার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। বায়রাকে পাশ কাটাইয়া জি টু জি অর্থাত্ গভর্মেন্ট টু গভর্মেন্ট জনশক্তি প্রেরণের যে উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে, তাহারই প্রতিবাদে সংগঠনটি এই সিদ্ধান্ত লইয়াছে। বায়রার নেতৃবৃন্দ এই অভিযোগও করিয়াছেন যে, সরকারিভাবে লোক প্রেরণের নামে বাংলাদেশের শ্রমবাজার স্থবির করিয়া দেওয়া হইয়াছে। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহ তাহাদের কার্যক্রম বন্ধ করিয়া দিলে জনশক্তি রফতানি খাতে এখনই কিংবা অদূর ভবিষ্যতে কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে তাহা বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিবার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রহিয়াছে। তবে কোন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে লোক প্রেরণের সিদ্ধান্ত হইয়াছে, তাহাও বিবেচনায় রাখিতে হইবে। আমরা সবসময়ই বেসরকারি খাতের সক্রিয় ও অবাধ অংশগ্রহণের পক্ষপাতী। ব্যবসা-বাণিজ্য সরকারের কাজ নয়। বাজার অর্থনীতিতে বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং প্রতিযোগিতা থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। আমাদের অভিজ্ঞতাও এই সাক্ষ্যই দেয় যে, সরকার যখনই অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করিয়াছে কিংবা নিজেই ব্যবসা করিতে গিয়াছে, তখনই সমস্যা প্রকট হইয়াছে। বাংলাদেশের সরকারি মালিকানাধীন কল-কারখানা এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহের বেহালদশার সংবাদ কাহারও অজানা নহে। ইহার অর্থ এই নয় যে, আমরা লেইসেফেয়ারের (laissez-faire) কথা বলিতেছি। অর্থাত্ সরকার হস্তক্ষেপ করা হইতে সম্পূর্ণ বিরত থাকিবে-এমন নীতি বাস্তবসম্মতও নয়। আবার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ—তাহাও কাম্য নয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচাইতে বড় খাত জনশক্তি রফতানি। বিদেশে কর্মরত বহু লক্ষ মানুষ প্রতিবত্সর বিপুল অংকের রেমিট্যান্স দেশে পাঠাইয়া থাকেন। এই খাতটিকে বিকশিত করিয়াছে কিন্তু বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্টরাই। বর্তমানে বিদেশে আমাদের যত কর্মী রহিয়াছেন, তাহাদের এক সামান্য অংশই গিয়াছেন সরকারি ব্যবস্থাপনায়। সিংহভাগ গিয়াছেন বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলি অনেকসময় নিজেরাও বিদেশে জনশক্তির বাজার অনুসন্ধান করে এবং সরকারের অনুমোদন লইয়া লোক প্রেরণ করে। এই সবই সত্য। কিন্তু, ইহাও অসত্য নয় যে, একশ্রেণীর রিক্রুটিং এজেন্সি জনশক্তি রফতানির নামে ইতিপূর্বে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের ফাঁদে পড়িয়া বিদেশ গমনেচ্ছু বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হইয়াছে। পথে বসিয়াছে বহু পরিবার। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়াই বিদেশে লোক পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। পরিণামে বিদেশ গিয়া অনেককে অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে নিপতিত হইতে হইয়াছে। অনেকের ঠিকানা হইয়াছে কারাগার। ইহাতে বিদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে দেশের ভাবমূর্তি। এইরকম পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হইতে লোক নেওয়া বন্ধই করিয়া দিয়াছিল। সউদী আরবেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অবৈধ প্রবাসী বাংলাদেশি রহিয়াছেন। তাহাদের জীবন দুর্বিষহ। আবার প্রকৃত ফি’র তিন-চারগুণ বেশি টাকা নিবার অভিযোগও রহিয়াছে। বিপুল অংকের টাকা নেওয়ার পরও বিদেশে পাঠান হয় নাই কিংবা বত্সরের পর বত্সর ঘোরান হইতেছে-এমন অভিযোগও আছে একশ্রেণীর এজেন্সির বিরুদ্ধে। এহেন রূঢ় বাস্তবতায় মালয়েশিয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র চল্লিশ হাজার টাকায় কর্মী প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। মালয়েশিয়া সরকারও এইরূপ চাহিয়াছে। সম্প্রতি শুরু হইয়াছে বিদেশ যাইতে ইচ্ছুক নারী কর্মীদের নিবন্ধন। সরকারের এইরূপ উদ্যোগের ফলে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহের ব্যবসা বন্ধ হইবার উপক্রম। এমতাবস্থায় তাহারা প্রতিবাদী হইয়া উঠিয়াছে। বায়রার নেতারা এখন বলিতেছেন যে, তাহারাও সরকারের মত কম খরচে বিদেশে লোক পাঠাইতে সক্ষম। আর যেইসব অনিয়মের অভিযোগ রহিয়াছে, সেইসবও তদারকির মাধ্যমে বন্ধ করা সম্ভব। আমাদের কথা হইল, সরকারি ব্যবস্থাপনায় লোক প্রেরণের পাশাপাশি বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেও জনশক্তি রফতানি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে এই ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করিতে হইবে। আর, এই নিশ্চয়তা বিধান কিভাবে সম্ভবপর হইবে, তাহা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্থির করিয়া নেওয়া কর্তব্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন