রাশিয়ার সাথে করা চুক্তি অনুযায়ী রূপপুরে দেশের সর্বপ্রথম পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে। অনেকে আশা করছেন ২০২০ সালের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে যেখানে প্রতিটি এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি রিঅ্যাক্টর থাকবে। দেশের বিদ্যুত্ ঘাটতি এবং চাহিদাকে মাথায় রেখে নতুন বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন জরুরি। সেক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র হতেই পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেটা রূপপুরে কেন? আসলে এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে অতীতের ধারাবাহিকতাকেই বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। আমরা একটু পিছনে ফিরে তাকাই। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাটি করা হয় মূলত ১৯৬১ সালে। তারপর পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ১৯৬৩ সালে ঢাকা শহরের ২০০ কিলোমিটার উত্তরে পাবনা জেলার রূপপুরে পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা শুরু হয়। তারপর স্বাধীনতার পর ১৯৮০ সালে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রস্তাব পাস হলেও সেটা আর করা হয়নি। আমরা এখন দেখছি ঐ একই স্থানে পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। এখানে কিছু বিষয় না বলে থাকা যাচ্ছে না। যেমন অধিকাংশ পারমাণবিক কেন্দ্রই সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল অথবা আশেপাশে বিপুল পরিমাণ পানির উত্স আছে এমন জায়গায় হয়ে থাকে। কেননা পারমাণবিক কেন্দ্রের চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা রাখতে প্রতিনিয়ত পানির প্রয়োজন। বাংলাদেশে পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশনে দেয়া রিপোর্টেও পানি দিয়ে চুল্লিগুলোকে ঠাণ্ডা রাখার কথা বলা হয়েছে। কথা হচ্ছে আমাদের রূপপুরে এই পানি আসবে কোথা থেকে? ষাটের দশকে যখন এই জায়গাটি নির্ধারণ করা হয় সেই সময়ের পদ্মায় যে পরিমাণ পানি ছিল এখন তো আর সেই অবস্থা নেই। পানির প্রাপ্তিও সারাবছর একই রকম থাকে না। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে ৬-৭ লাখ কিউসেক পানি পাওয়া যায়, মার্চ-এপ্রিল মাসে একই পয়েন্টে সেই পানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০০০ কিউসেক এ। এখন পর্যাপ্ত পানি যদি পাওয়া না যায় তাহলে কি আমরা আরেকটি ফুকোশিমার মতো ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিব যা কি না ঘটবে আমাদেরই দেশে? এর একটি সমাধান হিসেবে পাদ্মার উপর বাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা হয়তো কেউ করে থাকবেন যার মাধ্যমে সারা বছর প্লান্টের কাছে পর্যাপ্ত পানির পরিমাণ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এক ফারাক্কা আমাদের যা করছে তাতে পদ্মার উপর আরেকটা বাঁধ দেয়া মানে শুধু ভাটির মানুষের ক্ষতি করা না, সেই সাথে পদ্মার অবশিষ্ট জীবনীশক্তিটা কেউ শেষ করে ফেলা। এবার আসা যাক চুল্লি ঠাণ্ডা করার কাজে ব্যবহূত এই পানি যা কিনা দূষিত সেটা কোথাও না কোথাও ফেলতে হবে, যেমন পরিবেশে। তাহলে আরেকটা যে আশঙ্কা দেখা দিবে তাহলো রূপপুরের কাছেই ঈশ্বরদীতে যে জেলেপল্লী আছে তাদের কী হবে? সেই সাথে এই দূষিত পানির জন্য সেখানকার জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হবে সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো যাথাসম্ভব চেষ্টা করা হয় যেন জনবসতি থেকে দূরে থাকে। প্রতিটা কেন্দ্র থেকেই কিছু পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় অবস্থায় নির্গত হয়। এর আশেপাশে জনবসতি থাকলে সেখানকার অধিবাসীরা ক্যান্সারসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, সেখানকার শিশুদের জন্মের সময় নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রস্তাবিত জায়গার ৫-১০ মেইল ব্যাসার্ধ জুড়ে অনেক মানুষ বাস করছে। তাদের জীবনের নিরাপত্তার কথা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
আমাদের আরেকটি ব্যর্থতা হলো আমরা নিজ দেশে আমাদের মধ্য থেকে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারিনি। পঞ্চাশ বছর ধরে প্রস্তাবটি ঝুলে ছিল। অথচ এই সময়ের মধ্যে আমরা পাঁচজন মানুষকেও দক্ষ করে তুলতে পারিনি, যার ফলে আমাদের প্রতিটা ক্ষেত্রেই বাইরের মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে এদেশের একজন দক্ষ মানুষ যে পরিমাণ উদ্বিগ্ন থাকবে, নিশ্চয় বাইরের কেউ, সে যত অভিজ্ঞই হোক না কেন, সে পরিমাণ উদ্বিগ্ন থাকবেন না। আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হত বাইরের পরামর্শকের সাথে যৌথভাবে দেশের কিছু পরামর্শক রাখা, হোক না তিনি কম অভিজ্ঞ। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের অভিজ্ঞতা তো আমরা কাজে লাগাতে পারবো।
আমরা কেন সেই ষাটের দশকের লোকেশন ক্লিয়ারেন্সের উপর ভিত্তি করে পঞ্চাশ বছর পর সেই জায়গায় পারমাণবিক স্থাপনা বানাব? এটা তো কোন সাধারণ অবকাঠামো না, এখানে দুর্ঘটনা ঘটলে এটার ভয়াবহতা আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বন্যাকবলিত একটি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে বাড়তি নিরাপত্তার কথাটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। আমরা কি এসব চিন্তা করছি, না কি একটা নতুন প্রযুক্তির সুফল ভোগের আশায় এসব চিন্তাকে আমলে নিচ্ছি না?
পরিশেষে শুধু এতোটুকুই বলবো, বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুত্ ঘাটতি মেটাতে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু এর পেছনে প্রয়োজনীয় যে ব্যবস্থাগুলো আছে সেটার পুনর্মূল্যায়ন অতীব জরুরি। সেক্ষত্রে সময় বেশি লাগলে লাগতে পারে। আমরা যদি ৫০ বছর অপেক্ষা করতে পারি তবে আর কয়েকটি বছর অপেক্ষা করতে তো সমস্যা হওয়ার কথা না। কেননা যেকোন দুর্ঘটনা হলে এর ফল তো ভোগ করতে হবে আমাদেরই।
লেখক :পরিবেশ প্রকৌশলী
