জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রবেশাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও সেই প্রবেশাধিকার বাংলা পায়নি। বাংলার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, আন্তরিকতা পদে-পদে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাকে আমরা যথাযথ সম্মান কিংবা মর্যাদা দিতে পারিনি। বাংলার ব্যবহার যতোটা ব্যাপক ও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিলো, তা না হলেও বাংলা ভাষা ব্যবহারে বিকৃতি ও দূষণ দিনে দিনে বাড়ছে। আমরা শুদ্ধভাবে বাংলা বলছি না, অনেক ক্ষেত্রে লিখছিও না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কথ্য বাংলা ইংরেজি ও হিন্দির মিশেলে অদ্ভুত এক শংকর ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা আমাদের ভাষাকে রুগ্ন করছে।
যে কোনো বিবেচনায়ই আমাদের দেশে সকল ক্ষেত্রে বাংলা অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করা হলেও সকল ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহূত হচ্ছে না। নিম্ন আদালতে বাংলার ব্যবহার থাকলেও উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহূত হয় না। অল্প কিছু মামলার রায় বিচারপতিগণ বাংলায় দিয়েছেন। উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিচারপতি, আইনজীবী, আদালত কর্মকর্তা কেউই আগ্রহী নন। এক সময় ক্যাডেট কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়ানো হতো, এখন সেখানেও ইংরেজিতে পড়ানো হয়। যেসব বিষয় এক সময় বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমে পড়ানো হতো, এখন সে সব বিষয়ের মধ্যে কোনো কোনো বিষয় কেবলমাত্র ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। এজন্য আমাদের হীনমন্যতাবোধ ও গ্লানিবোধই দায়ী। অথচ বাংলা নিয়ে হীনমন্যতাবোধ ও গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা—বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা। জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলার প্রয়োগে আমরা এখনো কুণ্ঠিত। অথচ তা হওয়ার কথা ছিলো না। একুশের পূর্ণাঙ্গ দাবি এখনো পূরণ হয়নি। জনস্বার্থে সকল ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি আমরা। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে হলেও বাংলা ব্যবহার করা জরুরি। অথচ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান দুস্তর। বাংলা ভাষায় যে কোনো ভাব, অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব। এ ভাষার ধারণ ক্ষমতা, আত্তীকরণ ক্ষমতাও অসাধারণ। এরপরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার অবাধ না হওয়ার পিছনে আমাদের মানসিকতা দায়ী। বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা প্রকাশ ক্ষমতা যে কোনো শীর্ষস্থানীয় ভাষার সঙ্গে তুলনীয়। দেখে-শুনে মনে হয় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্যে আরো সংগ্রাম করতে হবে। এ সংগ্রাম আত্মরক্ষার সংগ্রাম। একুশের চেতনা থেকে শক্তি ও সাহস নিয়ে আমাদের এ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলা ভাষা আজো অবহেলা ও নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষা আর কতো দিন গরিব মানুষের ভাষা হয়ে থাকবে। বাংলা এদেশের ধনী-গরিব উভয়ের কাছেই নমস্য হওয়া উচিত। অথচ বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মতো গরিব দেশেও অপ্রয়োজনে ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দিচ্ছে নানা কৌশলে, নানা মতলবে। সাম্রাজ্যবাদী এই চক্রান্ত থেকে বাংলা ভাষাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। বাংলাদেশে ইংরেজির দাপটের জায়গায় বাংলার দাপট তৈরি করতে হবে এবং তা করতে হবে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের স্বার্থেই। বাংলা ভাষার ক্ষমতায়ন না হলে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। বাংলা ভাষার যেহেতু গাঠনিক দুর্বলতা নেই, সেহেতু বাংলাদেশের মানুষ আন্তরিক ও সচেষ্ট হলে অফিস-আদালতে, জ্ঞানে বিজ্ঞানে, আদালতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলা ব্যবহার করে বাংলাকে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলার দাপট বাড়াতে পারে। বাংলা ভাষা কোণঠাসা হয়ে প্রান্তিক অবস্থানে থাকবে, বাংলা ভাষাভাষী হিসবে সেটি আমরা আর হতে দিতে পারি না। বাংলা ভাষাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে, তাহলে বাংলাদেশও ঘুরে দাঁড়াবে।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক
e-mail:[email protected]
