যে দেশ সপ্তাহে পাঁচদিনই হরতাল আর সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে থেমে থাকে, সে দেশের উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব? শিল্প-কারখানার চাকা যখন বন্ধ হয়ে থাকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন তালা ঝোলে, অফিস-আদালতে আসতে যখন লোকে ভয় পায়, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এমন কেন হচ্ছে? আর কতদিনই বা এভাবে চলতে থাকবে? এর সমাধান কী?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা সবাই নানা দলে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছি। সমপ্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আন্দোলন থেকে সমাজে বিদ্যমান বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্ম আজ দ্বিধাবিভক্ত, তাদের সামনে কোন আদর্শ কিংবা যোগ্য নেতৃত্ব নেই। ফেইসবুক আর ব্লগে যে যার মত বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলছে, একে অন্যকে দোষারোপ করছে, তীব্র ঘৃণায় বিষিয়ে উঠছে দেশের লাখ লাখ তরুণের মন।
আজ তরুণদের মধ্যে যে উগ্রতা, ঘৃণা আর বিভক্তি দেখে আমরা শিউরে উঠছি, তা একদিনে গড়ে ওঠেনি, এর মূল লুকিয়ে আছে অনেক গভীরে। অনেক বড় সমস্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ আজ চোখের সামনে হঠাত্ করে উন্মোচিত হয়ে আমাদের হতবাক করে দিয়েছে। তিন ভাগে বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক অলিখিত বিভাজন করে দেয়। তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার কোন সুযোগ থাকে না। একে অপরের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে তারা বেড়ে ওঠে, দিনকে দিন এ বিভাজন আরও বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদেশের তরুণদের খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাদের নিয়ে কাজ করেছি। আমরা ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম ও মাদ্রাসা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একসাথে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছি, তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী সৃষ্টি করেছি, দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে এক হতে উদ্বুদ্ধ করেছি। মাত্র কয়েক মাসের প্রশিক্ষণে আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বিপরীত মানসিকতার, ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী এই তরুণদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও একতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করেছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা যে ছেলেটি জীবনে কখনও কোন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেনি, বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থী যে মেয়েটি কখনও নিজের বাড়ি আর স্কুলের বাইরে কোথাও পা ফেলেনি, তারা সবাই একসাথে বস্তিতে গিয়ে নিজেদের উদ্যোগে উন্নয়নমূলক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গত চার বছরে বিওয়াইএলসি থেকে দশটি বিবিএলটি ব্যাচ ও ছয়টি বিবিএলটি জুনিয়র ব্যাচে প্রায় পাঁচশ তরুণ শিক্ষার্থীকে নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং কাজকেন্দ্রিক নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে তারা নিজেদের ব্যবহার ও মনমানসিকতার পরিবর্তন এনে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করতে শেখে। এই শত শত তরুণ-তরুণী যদি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এসে, ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী হয়েও একটি সমষ্টিগত আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একসাথে সফলভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে তা কেন সম্ভব নয়?
ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতির স্বার্থে আমাদের এক হতে হবে। রাজনৈতিক চেতনা যাই হোক না কেন, ৭১-পরবর্তী প্রজন্ম যদি বাংলাদেশকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে, তাহলে এ দেশের উন্নয়ন কেউ আটকাতে পারবে না। ভিন্ন মত ও পথের অনুসারীরা অন্তত দেশ গড়ার কাজে একতাবদ্ধ না হলে বর্তমান স্থবিরতা আর সহিংসতার অবসান ঘটবে না। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, তার মতামত শুনে তারপর নিজের মত প্রকাশ করতে হবে। প্রচলিত ধারার সাথে ভেসে না গিয়ে নিজের যুক্তি, বিচার-বিবেচনাকে কাজে লাগিয়ে ভেবে দেখতে হবে কী করছি, কেন করছি, এর ফলাফল কী হতে পারে, আমার কাজে দেশের আদৌ কোন উপকার হচ্ছে কিনা। কোন পক্ষের অন্ধ অনুসারী না হয়ে চোখ কান খুলে, চিন্তা করে কাজ করতে হবে, মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হলে চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, কাজ করতে করতেই ফিরে দেখতে হবে এখানে আসলে কী চলছে; প্রশিক্ষণের সময় একে আমরা বলি, “Reflection in the midst of action”।
পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ আর সংঘাত আমাদের জাতি হিসাবে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে, আর নয়। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নীচে। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক সময় আর হতে পারে না। ২০১২ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বাংলাদেশের আঠার লাখ তরুণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। কিন্তু দেশে নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে মাত্র দুই লাখ। সাত লাখ তরুণ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, বাকি নয় লাখ তরুণ হয়ে পড়ছে বেকার। আমাদের খুঁজে দেখতে হবে এই সমস্যার মূল কোথায়। শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু সার্টিফিকেট সর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, কাজের ক্ষেত্রে যেসব দক্ষতা প্রয়োজন তা শেখাচ্ছে না। চাকরির পাশাপাশি যদি তরুণ সমাজ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, তাহলেও বিপুল সংখ্যক তরুণের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা, যা বাস্তবমুখী শিক্ষা দেবে ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে।
তরুণ প্রজন্মের একজন হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আসুন পরস্পরবিদ্বেষী মনোভাব পরিহার করে দেশের অচলাবস্থার সমাধান খুঁজে বের করি, দেশের স্বার্থে একটি ঐকমত্যের অবস্থান তৈরি করি। নিজেদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা অতীতেও বহুবার দেশকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ব্যক্তি বা দলের বদলে আমাদের দেশের উন্নয়নে একটি সর্বজনীন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে হবে, তবেই এই অচলাবস্থা থেকে দেশের সাধারণ জনগণ মুক্তি পাবে।
লেখক :প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি)
