মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই তার জীবনযুদ্ধকে সহজ করতে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে কাটিয়েছে ব্যস্ত সময়। একটা সময়ে এসে মানুষ সক্ষম হলো প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে। তখন থেকেই জীবনকে নানা রঙে সাজিয়ে তুলতে শুরু হলো মানুষের প্রচেষ্টা। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি সেই প্রচেষ্টাকে ফুলে-ফলে ভরিয়ে তুলতে শুরু করল। এর ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষ প্রথমবারের মতো এমন একটি প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হলো, যাতে করে কোনো ধরনের তারের ব্যবহার ছাড়াই তথ্যকে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে পাঠানো যায়। স্যামুয়েল মোর্স তার উদ্ভাবিত মোর্স কোডের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল এক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন এক বিপ্লব সংঘটিত হয় আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেলের হাত ধরে। ১৮৭৬ সালে তিনি উদ্ভাবন করেন এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন স্থানের দুইজন মানুষ একটি যন্ত্র ব্যবহার করে কথা বলতে পারেন। টেলিফোন নামে যে যন্ত্রটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে, সেটিই উদ্ভাবন করেন বেল। টেলিফোন খুব দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং অসম্ভব, জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়। তবে বিজ্ঞানীরা কিন্তু সন্তুষ্ট ছিলেন না এই টেলিফোন নিয়েও। টেলিফোন ব্যবহারের জন্য তারের সংযোগ ছিল আবশ্যক। তারহীন যোগাযোগের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তাই চলে নিরন্তর গবেষণা। অবশেষে ১৯৭৩ সালে এসে সেই চেষ্টা সফল হয়। মটোরোলার প্রকৌশলী ম্যাট কুপার তৈরি করেন প্রথম এমন কোনো টেলিফোন, যেটি কিনা তারের সংযোগ ছাড়াই কথা বলার সুযোগ দেয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে মটোরোলা সেই প্রথম টেলিফোন উদ্ভাবনের স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে। তখন অবশ্য মোবাইল ফোন শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়নি। মটোরোলা তাদের উদ্ভাবিত প্রথম মোবাইলটিকে বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ‘পোর্টেবল টেলিফোন’ হিসেবে।
প্রথম মোবাইল ডায়না টিএসি
ম্যাট কুপারের তৈরি প্রথম মোবাইল ফোনটির নাম ছিল ‘ডায়না টিএসি’। প্রথম এই মোবাইল ফোনটি প্রদর্শন করা হয় ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল। এদিন এই মোবাইল ফোন সম্পর্কে তিন পাতার একটি প্রচারপত্র ছাপায় মটোরোলা। মোবাইল ফোনটির পরিচিত সম্পর্কে মটোরোলা জানায় ‘হাতে ধরার উপযোগী সম্পূর্ণ বহনযোগ্য টেলিফোন যা এর ব্যবহারকারীকে ভার্চুয়াল মেট্রো এলাকার যেকোনো স্থান থেকে কল করতে এবং কল রিসিভ করতে সমর্থ করবে। এই সিস্টেমের নাম ‘ডায়না টিএসি’। নতুন এই ডায়না টিএসি বহনযোগ্য তারহীন টেলিফোন বেতার তরঙ্গে পরিচালিত হয় এবং যেকোনো ধরনের টেলিফোনেই কথা বলতে সক্ষম।’
অ্যানালগ ‘১জি’ নেটওয়ার্ক
মোবাইল ফোন তো উদ্ভাবন হলো ১৯৭৩ সালে। কিন্তু এটি পরিচালনার জন্য আলাদা নেটওয়ার্কের কাজ তখনও শুরু হয়নি। মটোরোলা জানায় ১৯৭৬ সালে এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত শুরু করতে পারবে তারা। সেই অনুযায়ী নেটওয়ার্ক তৈরির কাজও শুরু হয়ে যায়। প্রথম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি হয় ১৯৭৭ সালে শিকাগোতে। বলা বাহুল্য, এই নেটওয়ার্ক ছিল অ্যানালগ। এটি তৈরি করে এটিঅ্যান্ডটি। এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সর্বসাধারণের বাজারজাত করা মোবাইল হিসেবে মটোরোলা নিয়ে আসে ডায়না টিএসি ৮০০০এক্স। এর দাম ছিল তখনকার সাড়ে তিন হাজার ডলার। ফলে মোবাইল নিয়ে মানুষের মাঝে অনেক আগ্রহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত দামের কারণেই এটি সবার হাতে পৌঁছাতে পারেনি শুরুতে।
ডিজিটাল সেলুলার ‘২জি’ নেটওয়ার্ক
‘১জি’ নেটওয়ার্ক দিয়ে মোবাইল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলেও নব্বইয়ের দশকে এসে দুই নতুন প্রযুক্তি আসে বাজারে—জিএসএম এবং সিডিএমএ। দ্বিতীয় প্রজন্মের ডিজিটাল এই নেটওয়ার্ক মোবাইল ফোনে এসএমএস করার সুবিধাও যুক্ত করে। মোবাইল ফোনে ডাউনলোডের সুবিধাও যুক্ত হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। মোবাইলের জন্য রিংটোন ডাউনলোডের সুবিধাই ছিল প্রথম ডাউনলোডের সুবিধা। ১৯৯৯ সালে জাপানের এনটিটি ডোকোমো এই দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই চালু করে ইন্টারনেটের সেবা।
থ্রিজি-মোবাইল ব্রডব্যান্ড এবং ফোরজি
দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটযুক্ত হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এনটিটি ডোকোমো নিয়ে আসে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক। ২০০১ সালের অক্টোবরে প্রথম থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালু করে তারা। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইতালিও খুব দ্রুত এই নেটওয়ার্ক চালু করে। থ্রিজি নেটওয়ার্কেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ব্রডব্যান্ড সুবিধা উপভোগ করার সুবিধা তৈরি হয়। থ্রিজির পরে অবশ্য চতুর্থ প্রজন্মের এলটিই নেটওয়ার্ক ও বিশ্বব্যাপী যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের দেশে অবশ্য থ্রিজি নেটওয়ার্কই যাত্রা শুরু করেছে কয়েকমাস হলো।
এবং স্মার্টফোন
মোবাইল ফোন যেমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাপী, তেমনি আরেক বৈপ্লবিক ঘটনা বলা যায় স্মার্টফোনের আগমনকে। অ্যাপল’র স্বপ্নদ্রষ্টা স্টিভ জবস-এর হাত ধরে ২০০৭ সালে বাজারে আসে ‘আইফোন’, যা পূর্ণাঙ্গ একটি স্মার্টফোনকে পৌঁছে দেয় মানুষের কাছে। এর আগে নকিয়া ও এরিকসন কয়েকটি মডেল তৈরি করলেও আইফোনকেই বলা যায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্মার্টফোন। আর এরপর থেকেই গোটা বিশ্ব ঝুঁকে পড়েছে স্মার্টফোনের দিকে। বিশ্বব্যাপী মোবাইল ফোনের এক-চতুর্থাংশই এখন স্মার্টফোনের দখলে। ফিচার ফোনের বদলে স্মার্টফোনের বিক্রিই বাড়ছে। সামনের দিনে মোবাইল ফোনের বাজারের প্রায় পুরোটাই দখল করে নেবে স্মার্টফোন—এমনটাই মন্তব্য প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
বিশ্বের জনসংখ্যাকে পেরিয়ে যাবে মোবাইল ফোন
নব্বইয়ের দশক থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে মোবাইল ফোনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে মোবাইল ফোন। গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় মোবাইল সংযোগের সংখ্যা পেরিয়ে যায় ছয়শ কোটি। বিশ্বের জনসংখ্যা বর্তমানে সাতশ কোটির বেশি হলেও জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন ধারণা করছে, চলতি বছরের শেষের দিকে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা পেরিয়ে যাবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যাকে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, ইরান, ইতালি, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশেই মোবাইল সংযোগ জনসংখ্যার চাইতে বেশি। আমাদের দেশেও প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন।
মোবাইল ফোন নিয়ে মজার কিছু তথ্য
মার্টিন কুপার মোবাইল ফোন উদ্ভাবনের পর প্রথম ফোন দেন বেল ল্যাবে মোবাইল ফোন নিয়ে কাজ করা তারই এক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৌশলী জো এঙ্গেলকে।
ব্রিক নামে যে বাণিজ্যিক মোবাইল ফোনটি বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে, তার মূল্য ছিল ৪ হাজার ডলার! এর ওজন ছিল ৭৮৫ গ্রাম, মানে প্রায় ১ কেজি।
১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর নেইল পাপওয়ার্থ মোবাইল ফোনে প্রথম এসএমএস করেন। প্রথম পাঠানো সেই এসএমএস-এ পাপওয়ার্থ লিখেছিলেন ‘Merry Christmas’।
প্রথম ক্যামেরা ফোনটি তৈরির কৃতিত্ব ফিলিপ কান’র। ১৯৯৭ সালে এটি দিয়ে তিনি তার সদ্যজাত মেয়ের ছবি তোলেন।
বিশ্বের সবচেয়ে খরুচে নম্বর ৬৬৬-৬৬৬৬। ২০০৬ সালের ২৩ মে কাতারে এক নিলামে ১০ মিলিয়ন কাতার রিয়েলে (প্রায় ২.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিক্রি হয় এই নম্বর।
এক নজরে মোবাইলের ইতিহাস
১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম মোবাইল ফোন দেখে প্রযুক্তি বিশ্ব। এরপরে ১৯৮৩ সালে বাজারে আসে প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল। প্রথম মোবাইল ফোনের টকটাইম ছিল মাত্র ২০ মিনিট। সময়ের সাথে সাথে এটিও বাড়তে থাকে, যুক্ত হতে থাকে নতুন ফিচার, নতুন মডেল। একসময় আসে স্মার্টফোন। মোবাইল ফোনের ইতিহাস নিয়ে প্রযুক্তি বিষয় ওয়েবসাইট ম্যাশাবল সম্প্রতি তৈরি করেছে একটি ইনফোগ্রাফিক। তথ্যপ্রযুক্তি পাতার পাঠকদের জন্য তার একটি অংশ বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হলো।
