বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কবি নজরুল ইসলাম হলের ২২৪ নং কক্ষে ঢুকিয়া দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়া কোপাইয়াছে যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আরিফ রায়হানকে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটিয়াছে গতকাল মঙ্গলবার। যতদূর জানা যায়, আহত ছাত্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত আরিফ রায়হান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তাহার রাজনৈতিক পরিচয় যাহাই হউক না কেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলের কক্ষে ঢুকিয়া প্রকাশ্য দিবালোকে দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালাইয়া যদি পার পাইয়া যায়, তাহা হইলে সাধারণ নাগরিকদেরও কোন নিরাপত্তা থাকিতে পারে না।
একদিকে পুলিশের অস্ত্র, হেলমেট ইত্যাদি কাড়িয়া নিয়া তাহা দ্বারা পুলিশকে পিটানো হইতেছে নির্দয়ভাবে, অন্যদিকে পুলিশের অস্ত্র কাড়িয়া লইয়া প্রতিপক্ষের উপর নগ্ন হামলা চালানো হইতেছে। গত সোমবার হেফাজতে ইসলামের হরতাল চলাকালে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মোড়ে কর্তব্যরত পুলিশের নিকট হইতে অস্ত্র ছিনাইয়া নিয়া গুলি ছুঁড়িবার একটি ছবি ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হইয়াছে গতকাল মঙ্গলবার। দেশে প্রায় প্রতিদিনই এমন লোমহর্ষক, অভূতপূর্ব ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। হাত-পায়ের রগকাটা সংস্কৃতি আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে, দেশ জুড়িয়া এসব কি শুরু হইয়াছে? বাংলাদেশে ৫০৫টি উপজেলা-থানা রহিয়াছে। ইহার মধ্যে এমন কোন জনপদ নাই, যেখানে রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে অস্থিরতা নাই। রাজধানী ও মহানগরীর বাহিরের অবস্থা বরং আরও খারাপ। মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলেও সর্বনাশা অস্থিরতার ছাপ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। গণহারে মামলা দেওয়ার কারণে অনেক এলাকাবাসীর ঘুম হারাম হইয়া গিয়াছে। পুলিশ আসামী ধরিতে গিয়া জনরোষের শিকার হইতেছে, পুলিশের গুলিতে অনেকের প্রাণ যাইতেছে। মাথা থেঁতলাইয়া ও বিবিধ উপায়ে পুলিশ হতাহতের ঘটনাও ঘটিতেছে ন্যক্কারজনকভাবে। রেললাইন উপড়াইয়া ফেলা হইতেছে, আগুন লাগানো হইতেছে এবং ব্রিজ, কালভার্ট ও রাস্তাঘাটের ক্ষতিসাধন করা হইতেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে সামাজিক জীবনেও ছন্দপতন ঘটিতেছে। সার্বিকভাবে বাড়িয়া গিয়াছে খুন-খারাবি ও অনাচার, যাহাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হইয়াছে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দলের অর্ধশত সিনিয়র নেতা এখন কারারুদ্ধ। সর্বশেষ একজন যুগ্ন মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করার কিছুক্ষণ পরই তাহাকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। অনেকে বলিতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অধিকাংশ মামলাই ঠুনকো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক। ‘৯০ উত্তর গণতন্ত্রের ২২ বত্সরে যেভাবে বাস পোড়ানো মামলায় বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাহা অতীতে আর কখনও হয় নাই ইত্যাদি। শুধু তাহাই নহে, কারা কর্তৃপক্ষ অসুস্থ সিনিয়র নেতাদের হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়াছেন। এমনকি আমরা এবার দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ও ভিন্ন মত পোষণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করিয়া ডান্ডাবেড়ি পরাইয়া আদালতে উপস্থিত করিতে দেখিলাম। একটি স্বাধীন দেশে এই ধরনের রাজনীতি কাম্য নয়। অন্যদিকে আমরা দেখিতেছি বিরোধী দলে থাকিলে এক নীতি আর ক্ষমতায় গেলে অন্যনীতি। মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে রাতারাতি দেখা যায় বিরাট পরিবর্তন। এই স্ববিরোধিতা আমাদের রাজনৈতিক সংকটকে আরও বাড়াইয়া দিতেছে।
দেশ যে পথে যাইতেছে, তাহাতে মানুষের নিরাপদে চলা-ফেরা ও আয়-উপার্জন করিয়া বাঁচিয়া থাকা কঠিন হইয়া পড়িতেছে। দেশ ক্রমেই আরও অস্থির ও অনিরাপদ হইয়া উঠিতেছে। ইহার শেষ কোথায় তাহা আমরা জানি না। তবে সবকিছু এভাবে চলিতে পারে না। রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসনে আমরা দেশপ্রেমের পরিচয় প্রদান ও সকল পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হউক-এই কামনা করি।
